Saturday, August 13, 2011

পুলিশের নৃশংসতা বেড়েই চলেছে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড নাছির উদ্দিন শোয়েব - আমার দেশ

পুলিশের নৃশংসতা বেড়েই চলছে। ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। পুলিশ বাহিনীতে অনেকটা বেসামাল অবস্থা। রাজনৈতিক দল দলনেই পুলিশের অতিউত্সাহ একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এতে এই বাহিনী এখন ব্যাপকভাবে সমালোচিত। নিরপরাধ মানুষের ওপর পুলিশি নির্যাতনে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবাধিকার। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও হতাশ ও ক্ষুব্ধ। পুলিশের নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনায় আদালত রুল দিতে বাধ্য হয়ছেন। ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গঠন করা হয়েছে কমিটি। সাসপেন্ডসহ বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশের প্রতি আস্থা না থাকায় নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরে দফায় দফায় বৈঠক করেও কাজ হচ্ছে না। কোনো অবস্থাতেই শৃঙ্খলা ফিরে আসছে না পুলিশ বাহিনীতে।
সুপ্রিমকোর্টের খ্যাতনামা আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদকে আটক এবং নির্যাতনের কারণে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আব্দুল কাদেরকে আটকের পর ডাকাত সাজিয়ে নির্যাতন, নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে ডাকাত সন্দেহে কিশোর মিলনকে পিটিয়ে হত্যা, আমিনবাজারে ছয় ছাত্রকে গ্রামবাসী কর্তৃক পিটিয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে পুলিশের অবস্থান, এর আগে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর বর্বরোচিত হামলা, হরতালে মিছিলে অংশ নেয়া নারীদের ওপর পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়া এবং বেধড়ক লাঠিপেটা, বিরোধী জোটের রাজনৈতিক নেতাদের আটকের পরই রিমান্ড ও টিএফআই সেলে নিয়ে নির্যাতন, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করতে এসে পত্রিকা অফিসে হামলা ও পুলিশের যুদ্ধংদেহী আচরণ, সম্পাদককে টিএফআই সেলে নিয়ে নির্যাতন, সম্প্রতি অনলাইন সংবাদ সংস্থা শীর্ষ নিউজ ও শীর্ষ কাগজের সম্পাদক একরামুল হককে আটক করে চোর-ডাকাতের মতো হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জয়নুল আবদিন ফারুকের ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্তের ফলাফল এখনও আলোর মুখ দেখেনি। এ ঘটনায় উল্টো পুলিশ বাদী হয়ে ফারুকসহ ১২/১৩ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। আর হামলাকারী পুলিশ সদস্য এডিসি হারুন ও এসি বিপ্লব কুমার সরকার চিকিত্সার নামে হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিছুদিন আগে এডিসি হারুন ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে আমেরিকা গিয়ে এখনও ফিরে আসেনি। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল কাদেরের ডাকাতির ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিন, এসআই আলম বাদশা এবং এএসআই তৌহিদুর রহমানকে হাইকোর্টের নির্দেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইন সচিবকে এ ঘটনা তদন্তের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের সহযোগিতায় কিশোর মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি রফিক উল্লাহসহ ৪ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জেলা পুলিশ সুপার হারুন-উর-রশিদ হায়দারী জানিয়েছেন, এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কমিটির প্রধান মাহবুব রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ হলো—‘দায়িত্ব পালনে পুলিশের গাফিলতি।’ তারা মিলনকে রক্ষায় যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। এজন্য ওসি রফিক উল্লাহ, এসআই আকরাম শেখ ও দুই কনস্টেবল আবদুর রহিম ও হেমারঞ্জন চাকমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে পুলিশ সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সাভারের আমিনবাজারে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত চলছে। কাদেরের ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এবং প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বরাবরই বলছেন, এগুলো বিচ্ছিন ঘটনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, ‘আমার পুলিশ বাহিনী’ কখনও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারি না। যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, আদালতের নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এপর্যন্ত আলোচিত কোনো ঘটনায়ই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ সদর দফতর থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
ঢাবি ছাত্র কাদের প্রসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেছেন, পুলিশ কাস্টডিতে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্মমভাবে নির্যাতন করেছে। এটা লজ্জাজনক। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে একজন পুলিশ বলেছে, পুলিশকে লাঠি দেয়া হয়েছে কি চুমো খাওয়ার জন্য? জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য। সেই লাঠিকে ব্যবহার করা হয়েছে একজন ছাত্রের ওপর। তার মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। ওসি বলেছেন, গণপিটুনিতে আহত হয়েছে। তবে যারা গণপিটুনি দিয়েছে, তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। বারবার এই গণপিটুনির কথা বলে ৫ জন, ৬ জন করে হত্যা করা হলো। এতে গণপিটুনি বৈধতা পাচ্ছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি গণপিটুনিকে বৈধতা দেয়ার কাজে উত্সাহ দেন, তাহলে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথায় যাবে? এ সময় আদালত বলেন, পুলিশের মানুষকে পেটানোর কোনো অধিকার নেই। পেটানোর দায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।
এমইউ আহমেদ হাসপাতালে : পুলিশের অমানবিক নির্যাতনে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন আছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমইউ আহমদ। হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক বলছেন, এমইউ আহমেদের জীবন সঙ্কটাপন্ন। তিনি হাইরিস্ক পেশেন্ট। ৭২ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত তার অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। গত বুধবার রাত দেড়টায় সাদা পোশাকধারী পুলিশ এমইউ আহমেদকে তার ১১৬, সেগুনবাগিচার বাসা থেকে গ্রেফতার করে। পরিবারের অভিযোগ, গ্রেফতারের সময়ই তাকে কিলঘুষি মারা হয়। তছনছ করা হয় বাড়ির মালামালা। গ্রেফতারের পর কিলঘুষি মেরে গাড়িতে ওঠায় ডিবি পুলিশ। পরে নেয়া হয় মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে (ডিবি)। সেখানে তাকে আরও নির্যাতন চালানো হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা জানান, নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরদিন ভোরে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় ডিবি পুলিশ নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ডাক্তাররা অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে তাকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেয়ার পরামর্শ দেন। বর্তমানে হাসপাতালে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে। তবে ডিবি পুলিশের এডিসি মেহেদি হাসান সাংবাদিকদের জানান, অ্যাডভোকেট এমইউ আহমদকে নির্যাতন করা হয়নি। পুলিশ আটক করে গাড়িতে তোলার পরই তিনি জানান, তার বুকে ব্যথা হচ্ছে।
কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীনের অভিযোগ : পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে গত ১৬ জুন রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ১২ জুনের হরতালে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জাসাস) একটি মিছিলে অংশ নেয়ায় পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ওই দিন বেলা ১২টার দিকে জাসাসের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল পেট্রোবাংলা কার্যালয় থেকে এফডিসির গেটের সামনে গেলে হঠাত্ করে পুলিশ আক্রমণ করে। এ সময় পুলিশ মধ্যযুগীয় কায়দায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রিজিয়া পারভীন অভিযোগ করেন, পুলিশ হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে তার সম্মানহানি করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমি শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ। আমার ওপর কেন এই নির্যাতন? একজন শিল্পীর ওপর হামলার ঘটনা গোটা জাতির জন্য লজ্জাজনক। সবাই মিলে এর প্রতিকার করা উচিত। এর আগে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি দেয়ায় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ। এ ঘটনায় ঢাকায় হরতাল পালন করা হলে সেখানেও পুলিশ হামলা করে। অন্যদিকে আমেরিকায় চিকিত্সা নিতে যাওয়ার আগে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, পুলিশ হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে ন্যামভবনের একটি কক্ষে গিয়েও তাদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে টানাহেঁচড়া করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে বিবস্ত্র্র করে লাঠিপেটা করেছে। তবে সেদিনের পুলিশের বেসামাল হামলার দৃশ্য মিডিয়ায় ফলাওভাবে প্রচার হওয়ায় দেশে-বিদেশে বহু লোক তা প্রত্যক্ষ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে পুলিশের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। পুলিশ বাহিনীতে দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ দেয়ার ফলে তারা কমান্ড মানছে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ বাহিনীতে দুটি বিশেষ এলাকার লোকদের প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই গোপালগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এই দুই অঞ্চলের বিশ্বস্ত এবং অনুগত পুলিশ সদস্যরা গুরত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব পুলিশ সদস্যের সঙ্গে মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশনাও উপেক্ষা করে চলছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ওইসব দলীয় পৃষ্ঠপোষক পুলিশ সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনাও সঠিকভাবে মানছেন না । কেননা তারা একাধিক নেতা, মন্ত্রী ও এমপির আশীর্বাদপুষ্ট। তাদেরকে সহজেই বদলি ও শাস্তিও দিতে ব্যর্থ হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রসঙ্গত, গত হরতালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর হামলাকারী দুই পুলিশ কর্মকর্তাই কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদ্বয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

সমাজের অন্ধকারে বিপন্ন মানুষ

আবুল কালাম আজাদ
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আমাকে বহনকারী জিপ গাড়িটি সহযাত্রীসহ পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অল্পের জন্য সেদিন আমি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে আমার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ফলে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নানা কাহিনী, দুঃখ, বেদনা, অব্যক্ত কথা, অব্যক্ত মর্মবেদনা, না বলা রূঢ় বাস্তবতার নির্মম কাহিনী শুনে কখনও কখনও স্তম্ভিত হয়েছি


জনপ্রতিধিদের নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, তাদের একটি অংশ এসেছে ছাত্ররাজনীতি থেকে, একটি অংশ নীতিহীন বুদ্ধিজীবী মহল থেকে, একটি অংশ মতলববাজ উচ্ছিষ্টভোগী ধর্মব্যবসায়ীদের থেকে, একটি অংশ অনৈতিক ব্যবসায়ী থেকে, কেউ প্রবেশ করেছে ব্লাডি সিভিলিয়ানকে সামরিক গণতন্ত্র শেখানোর জন্য অস্ত্র হাতে। আবার কেউ কেউ মহলবিশেষের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে অথবা জনমতের সমর্থনেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দেশকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্যই জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধিত্ব সফল করতে দরকার নানা ধরনের, নানা পর্যায়ের কর্মী।
নেতৃত্বের প্রসঙ্গটি নানাভাবে পর্যবেক্ষণ এবং দলের প্রধানের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, গ্রাম থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা ধরনের এবং নানা পদের দলীয় লোক ও দলের সমর্থক কাজ করছে। মানুষ অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক দলের সমর্থক হয়ে বা নেতৃত্ব থেকে নিজের অস্তিত্বকে প্রকাশ করে। মানুষ রাজনীতি ছাড়াও ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা অন্যান্য পেশার লোকজনের সঙ্গেও বিনি সুতার মালার মতো একতাবদ্ধ থাকে।
যারা রাজনীতি করেন তারা ছোটবেলা থেকেই নিজের সুপ্ত আশাকে প্রতিফলিত করার জন্য পথপরিক্রমার মাধ্যমে নেতৃত্বের স্বপ্নকেই সঙ্গে নিয়ে চলেন। নেতৃত্বের নানা বাধা অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পেঁৗছার জন্য শিক্ষানবিশ হিসেবে নেতাকর্মীদের বিশ্বস্ততা অর্জন করে রাজনীতিতে চলার পথ তৈরি করেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় একদিকে যেমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, অন্যদিকে তিক্ত অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আমাকে বহনকারী জিপ গাড়িটি সহযাত্রীসহ পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অল্পের জন্য সেদিন আমি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে আমার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ফলে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নানা কাহিনী, দুঃখ, বেদনা, অব্যক্ত কথা, অব্যক্ত মর্মবেদনা, না বলা রূঢ় বাস্তবতার নির্মম কাহিনী শুনে কখনও কখনও স্তম্ভিত হয়েছি।
প্রচারণার একপর্যায়ে একদিন রাতে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার গুর্জ্জিপাড়া হাটে ভোট সংগ্রহের জন্য যাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন কর্মীর পরামর্শে হাটের ছোট ছোট দোকানদারদের সঙ্গে সালাম বিনিময় ও হাত মেলানোর কাজ শুরু করি। সবাই কেনাবেচায় ব্যস্ত। এর মধ্যেই কুশল বিনিময় ও ভোটপ্রাপ্তির আবেদন। এভাবে সারা হাট ঘোরার পর হাটের এক কোনায় অবস্থিত মাছবাজারে যখন যাই, ঘড়িতে তখন রাত ১১টা। কেনাবেচার একেবারেই শেষ পর্যায়। বেশ কয়েকজন মাছ বিক্রেতার সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষ হয়েছে। হঠাৎ দেখি দু'জন মাছ বিক্রেতা তাদের ডালায় রক্ষিত প্রায় ছয় ইঞ্চি লম্বা সিলভার কার্প মাছের পেটে টিপে মাছটা পচে গেছে না ভালো আছে তা পরখ করছে।
জিজ্ঞাসায় জেনেছি, ওই দোকানিদের একজনের নাম আবদুল, অন্যজনের নাম জিতেন্দ্র। দু'জনের মাছ পরখ করার দৃশ্যটি দেখে মনে মনে আঁতকে উঠেছি। আমি ওদের মাছ বিক্রির বাস্তব অবস্থা নিয়ে চিন্তার গভীরে পেঁৗছে গেছি। বড়জোর আধঘণ্টার মধ্যে হাট শেষ হবে। তারা তাদের ওই অবিক্রীত মাছ পচে গেছে না ভালো আছে সেটা নিয়েই যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে, তখন অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা হলো, মাছগুলো প্রাকৃতিক জলাশয় বা বিল থেকে ধরা নয়। মাছচাষিদের কাছ থেকেই মাছগুলো কিনেছে তারা। লাভ করা দূরে থাক মূলধন রক্ষা করাই তাদের দায়। ঠিক সে সময়ের রূঢ় বাস্তবতা হলো, ক্ষুধার্ত স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা প্রয়োজনীয় চাল-ডাল কিনে তাদের ঘরে ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষারত।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে পীরগঞ্জের একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। গ্রামটি গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার ভেতরেই একটি ছিটমহলের মতো। রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের ধাপেরহাটের কাছে গ্রামটির অবস্থান। ছোট্ট গ্রাম। কয়েক ঘর মধ্যবিত্ত এবং বেশিরভাগ নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস এই রসুলপুর নামের গ্রামে। দেশের হাজার হাজার গ্রামে যেমন সব ধর্মের লোকের সহাবস্থান, এই গ্রামটিতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। মুসলমান ও হিন্দু উভয় ধর্মের লোকের অবস্থান গ্রামটিতে।
উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত গ্রামটি। বড় রাস্তা থেকে পূর্বদিকের রাস্তা ধরে হাঁটলে সরাসরি মসজিদ ঘরটির কাছ পর্যন্ত যাওয়া যায়। মসজিদের চারদিকে ইটের দেয়াল, ওপরে টিনের চালা। নির্বাচনী প্রচারণার একেবারেই শেষদিকে রাত ১১টায় মসজিদের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করি। প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইলে তারা দুঃখ করে বলেছিল, আমরা বরাবরই নৌকায় ভোট দিই। কিন্তু স্বাধীনতার পর কোনো নেতাকর্মী আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেননি। গ্রাম যাদের লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার-ব্যারিস্টার তৈরি করেছে, তারা এখন বড় বড় শহরে বাস করেন। আবার কেউ কেউ বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য পাড়ি জমান। শিক্ষিত লোক গ্রামে থেকে শহরে চলে যাওয়ার এ ধারা অব্যাহত থাকলে গ্রামগুলো আস্তে আস্তে অশিক্ষিত, টাউট-বাটপার এবং মিথ্যাবাদী লোকে ভরে যাবে।
গ্রামটির উত্তর দিকের দরিদ্র হিন্দু জেলেপাড়ায় যখন যাই রাত তখন সাড়ে ১১টা। পাড়ায় ঢুকেই তাদের পাড়ায় মন্দির আছে কি-না জিজ্ঞেস করেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের কাছে সবাইকে নিয়ে ভোট চাওয়া। উদ্দেশ্য মতো আমাকে নেওয়া হলো তাদের মন্দিরের কাছে। মন্দিরটির চারদিকে ছোট ছোট কুঁড়েঘরে জেলেদের বসবাস। একদিকের কোনায় মন্দিরটির অবস্থান। খড়ের চালের ছোট্ট একটা ঘরেই বসানো হয়েছে তাদের ঠাকুর দেবতাকে। ঘরটিতে দরজা-জানালার বালাই নেই। মন্দিরের ঘরটি এবং রক্ষিত ঠাকুর দেবতাকে দেখলেই এর চারপাশের বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থা সহজে উপলব্ধি করা যায়। সেখানে অধিকাংশ মহিলা তখনও জেগে আছেন। মন্দিরের পাশে অনেকেই সমবেত।
উপস্থিত লোকজনের মধ্যে মহিলার সংখ্যাই বেশি। মন্দিরের সামনে দাঁড়ানো এক গৃহবধূকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার নাম কী? উত্তরে বলেছিলেন শ্রীমতী। কৌতূহলে জিজ্ঞেস করেছি, তার রাতের খাবার তিনি রেঁধেছেন কি-না। শীর্ণকায় শরীর, বেশ চটপটে বউটি। হাসিমুখে বলেছিলেন, তার রাতের খাবার তিনি রেঁধেছেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার পরিবারের সদস্যসংখ্যা কত। বলেছিলেন_ শাশুড়ি, দুই বছরের মেয়ে এবং তারা স্বামী-স্ত্রী। এবার উপস্থিত মহিলাদের মধ্যে প্রায় জনাবিশেককে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা রাতের খাবার রেঁধেছেন কি-না। পিলে চমকে দেওয়ার মতো উত্তর দিয়েছেন_ না, তারা কেউ রাঁধেননি। ছোট মেয়েমেয়েরা অনেকেই অভুক্ত অবস্থায় শুধু পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
কেন তারা রাঁধেননি? বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর না পেয়ে আবার শ্রীমতীকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাকিরা তাদের খাবার রাঁধেননি কেন? এবার শ্রীমতী অবনতমস্তকে দুঃখভারাক্রান্ত মনে বিনীতভাবে খুব আস্তে আস্তে বলেছিলেন, আমাদের এ পাড়ার সবাই গরিব জেলে। পশ্চিম দিকের বড় রাস্তার ধারে নদীতে আমাদের পাড়ার লোকেরা মাছ ধরত। নদী এখন শুকনো। বর্ষায়ও আগের মতো আর তেমন মাছ পাওয়া যায় না। গ্রামের পাশের একসময় মাছে পরিপূর্ণ খাটমারা বিলটি বড়লোকেরা লিজ নিয়ে ভরাট করে ধান চাষ করে। আর গ্রামের পূর্বদিকের বিলটি এখন এলাকার মতলববাজ লোকরা লিজ নিয়েছে। সেখানে তারা আমাদের জেলেদের মাছ ধরতে দেয় না। বিভিন্ন পুকুরে চাষ করা মাছ কেনাবেচা করেই আমাদের পাড়ার জেলেরা সংসার চালায়। হাট শেষে তাদের ব্যবসার লভ্যাংশ দিয়েই চাল, ডাল, সবজি কিনে বাড়িতে ফিরবে। হাট বেশ দূরে হওয়ায় এখনও কেউ পাড়ায় ফেরেনি। তারা ফিরলেই সবার হাঁড়িতে চাল, ডাল, সবজি সিদ্ধ হবে। এর পরই হবে তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে খাওয়াদাওয়া। অত্যন্ত সত্য এবং বাস্তবতার নির্মম অবস্থাটির বর্ণনা শুনে গভীর দুঃখবোধে ভারাক্রান্ত হয়েছি। সে দিনের মতো প্রচারণার কাজ শেষ করে বাড়িতে ফেরার পথে মনে মনে ভেবেছি, যেসব পরিবারে এক সন্ধ্যা খাবারের সঞ্চয় থাকে না, আবদুল আর জিতেন্দ্রদের মতো জেলেদের মাঝরাতে অবিক্রীত মাছের পেট টিপে পচে গেছে কি-না পরখ করতে হয়, বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে পুরো পরিবার তীব্র ক্ষুধায় চাল, ডাল, সবজি নিয়ে জেলেদের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকে; বারবার মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, শতমুখী অভাবের এই দরিদ্র মানুষগুলোর সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব হবে?

আবুল কালাম আজাদ : সংসদ সদস্য

পায়ের কোথায় যেন জুতার পেরেক খোঁচাচ্ছে... - অজয় দাশগুপ্ত - সমকাল

ঘাতকের হাতে নিহত জাতির জনকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করাও ছিল সামরিক শাসকদের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। এটাও বলা দরকার যে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবল্পুব্দর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের কোনো সংবাদপত্রে এ সংক্রান্ত একটি লাইনও প্রকাশিত হয়নি। পরের দিনেও ছিল না দিবসটি পালনের কোনো সংবাদ। দেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্যই নাকি বঙ্গবল্পুব্দকে হত্যা করা হয়েছিল!


তিন যুগ_ ৩৬ বছর আগের কথা। ১৯৭৫ সালের প্রত্যুষে বঙ্গবল্পুব্দ নিহত হয়েছিলেন। এর এক বছর পর ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ : ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবল্পুব্দর বাসভবনে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ মাহফিল। তখনও সামরিক শাসন চলছিল। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সবাই জানত যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সরকারে তার দায়িত্ব অর্থ, তথ্যসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পদ। আর সামরিক আইন বলবতে তিনি রয়েছেন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে। নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদ্বয়ও দায়িত্ব পালন করছেন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগের সন্ধ্যায় বিচারপতি সায়েম এবং তিনজন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের মধ্যে একজন জিয়াউর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করেন। তবে এ ভাষণে তাদের একজনও বঙ্গবল্পুব্দ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারণ করেননি, শ্রদ্ধা নিবেদন তো দূরের কথা। সে সময়ের সংবাদপত্র এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত বেতার ও টেলিভিশনে স্বাধীনতার স্থপতি ছিলেন নিষিদ্ধ একটি নাম। তবে তাকে অপবাদ দিতে সক্রিয় ছিল চেনা একটি মহল। সরকারের উদ্যোগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও বঙ্গবল্পুব্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কুৎসা রটিয়ে প্রচার করা হতো এবং তা দেশের সংবাদপত্র-বেতার-টিভিতে ফলাও করে প্রচারের ব্যবস্থা করত সামরিক সরকার।
বঙ্গবল্পুব্দ হত্যার প্রথম র্বাির্ষকীর কয়েক দিন আগে ২৭ জুলাই (১৯৭৬) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের সভায় ৩০ জুলাই থেকে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। সামরিক ফরমান দিয়ে জানানো হয়, যারা রাজনৈতিক দল করতে চায় তাদের সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। দলের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি এবং গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য দলগুলো চার দেয়ালের মধ্যে বৈঠক করতে পারবে এবং এ সংক্রান্ত খবর সংবাদপত্রও প্রচার করতে পারবে। তবে সে সময়ে সংবাদপত্রে ছিল কড়া সেন্সরশিপ। সরকারের ইচ্ছার বাইরে কিছু প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। গণতন্ত্রের কী অপার মহিমা!
১৫ আগস্ট ঘাতকদের একাধিক সূত্র এবং ওই ভয়ঙ্কর সময়ে সেখানে উপস্থিত কেউ কেউ জানিয়েছেন, ঘাতকদের উদ্দেশে বঙ্গবল্পুব্দ বলেছিলেন, 'তাকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকেও হত্যা করা হবে।' এ কথা বলার পরপরই ঘাতকের ব্রাশফায়ারে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বঙ্গবল্পুব্দর শেষ কথাটি কতই না প্রফেটিক ছিল!
১৫ আগস্টের প্রথম বার্ষিকী পালন করতে গিয়ে আবারও তার প্রমাণ মিলেছিল। ঘরোয়া রাজনীতি চালু হওয়ায় বঙ্গবল্পুব্দর বাসভবনে ফুল দিয়ে শ্রদব্দা নিবেদনের মতো সাধারণ কর্মসূচি পালনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা সৃষ্টি করবে না, এমন ধারণা করেছিলেন উদ্যোক্তা ছাত্র নেতৃবৃন্দ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক শাসকদের চিনতে তাদের অনেক বাকি ছিল! ১৫ আগস্ট ভোরে নাজনীন সুলতানা (বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী অফিসার) এবং নিনু নাজমুন আরা নামে দু'জন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বঙ্গবল্পুব্দর বাসভবনের গেটে ফুল রেখে প্রথম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাদের বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে ছাত্রছাত্রীদের ছোট ছোট গ্রুপ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের পথে রওনা দেয়। কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দারা বঙ্গবল্পুব্দর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচির খবর জেনে গেছে। তারা আর কাউকে বাসভবনের গেটের কাছে তো দূরের কথা, ৩২ নম্বরেও প্রবেশ করতে দেয়নি। অনেককে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে মিলাদ অনুষ্ঠানকে ঘিরে রেখেছিল পুলিশের একটি বড় দল। তারা মিলাদে অংশ নিতে আসা ছাত্রদের নানাভাবে হয়রানি করে। ঘাতকের হাতে নিহত জাতির জনকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করাও ছিল সামরিক শাসকদের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। এটাও বলা দরকার যে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবল্পুব্দর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের কোনো সংবাদপত্রে এ সংক্রান্ত একটি লাইনও প্রকাশিত হয়নি। পরের দিনেও ছিল না দিবসটি পালনের কোনো সংবাদ। দেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্যই নাকি বঙ্গবল্পুব্দকে হত্যা করা হয়েছিল!
২৭ জুলাই (১৯৭৬) বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর) এবং সিপিবি_ এ তিনটি দলের নেতাদের কেন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকটি দলের নেতারা। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, ইউপিপি (কাজী জাফর আহমদ) প্রভৃতি দলের নেতারা সামরিক শাসকদের কাছে দাবি করেন যে শেখ মুজিবের অনুগামীদের কোনোভাবেই যেন রাজনীতি করার অধিকার প্রদান করা না হয়।
বঙ্গবল্পুব্দ একজন নন-এনটিটি বা কোনো কালে এমন কেউ ছিলেন না, এটাই চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠজনরা। ১৯৭৬ সালের ৪ আগস্ট সামরিক সরকার এক নতুন বিধি ইস্যু করে জানিয়ে দেয় :'জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করিয়া কোনো প্রকার ব্যক্তি পূজার উদ্রেক বা ব্যক্তিত্বের মাহাত্ম্য প্রচার ও বিকাশ' সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জিয়াউর রহমান-পরবর্তী সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের আমলেও বঙ্গবল্পুব্দ ছিলেন বাংলাদেশের শাসকদের কাছে নিষিদ্ধ।
কেন এমনটি তারা চেয়েছিলেন, সেটা স্পষ্ট। বঙ্গবল্পুব্দ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ছিলেন। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা তিনি সব সময় বলতেন। দেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অনুপুঙ্খ, অন্তর্দৃষ্টি ছিল গভীর। যারা বাংলাদেশ চায়নি একাত্তরে, তারা বঙ্গবল্পুব্দকেই স্বাধীন দেশের পথের কাঁটা মনে করেছে। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার পরও নব্য শাসকদের স্বস্তি ছিল না। স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি যেন রাজনীতির অঙ্গনে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য তারা দমননীতি ও অপপ্রচারসহ সব ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে শত শত নেতাকর্মীকে। মানবাধিকার বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সামরিক শাসকদের কাছে ছিল না। জিয়াউর রহমান প্রথমদিকে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে শিখণ্ডীর মতো সামনে রেখে ক্ষমতার দণ্ড পরিচালনা করেন। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক শাসকের পদ গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিচারপতি সায়েম সাহেবকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই সে পদ গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে সামরিক শাসন বজায় রেখেই দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে 'এক কোটিরও বেশি ভোটের ব্যবধানে'। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও ছিল দেশে সামরিক শাসন এবং এ সংসদই কুখ্যাত পঞ্চম সংশোধনী অনুমোদন করে, যা সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবল্পুব্দকে হত্যার সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা ছিল যথেষ্ট। এ ঘটনার মাত্র দুই মাস নয় দিন আগে (৬ জুন রাতে) একক রাজনৈতিক দল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল) এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এসব কমিটিতে অন্য কয়েকটি দলের কিছু প্রতিনিধি রাখা হলেও বিপুল প্রাধান্য ছিল আওয়ামী লীগ এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের। জেলা ও থানা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল এবং দেশের সর্বত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করায় তৎপর ছিল। এ সুযোগে যে ঘরের শত্রু বিভীষণরূপী খন্দকার মোশতাক আহমদকে সামনে রেখে ঘাতক চক্র শক্তি সঞ্চয় করে, সেটা তারা বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। এ কারণেই ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের পক্ষে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগে।
বর্তমানে এ দলটি অনেক সংহত। কিন্তু পঁচাত্তরের ঘটনাপ্রবাহের একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে সে সময়ের সঙ্গে যেন কিছুটা সামঞ্জস্যও খুঁজে পাই। তখন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অনেকের ব্যস্ততা ছিল নিজেদের নিয়ে। এখনও তেমন লক্ষণই প্রকট। দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্প এবং সরকারি-আধা সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ এখন যা করছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও এ ধরনের অভিযোগই ছিল তাদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন শফিউল আলম প্রধান, যার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য সাতজন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনার সামনে এখন যেসব এজেন্ডা তা বাস্তবায়নে সরকার ও দলের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ে আরও বেশি সক্রিয়তা আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গণতান্ত্রিক পন্থা ব্যতিরেকে অন্য উপায়ে ক্ষমতা দখলকে চিরকালের জন্য অবৈধ ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্থায়ী রূপ দেওয়া, ধর্মান্ধ জঙ্গি শক্তিকে দমন প্রভৃতি প্রতিটি পদক্ষেপে প্রবল প্রতিরোধ আসা স্বাভাবিক এবং সেটা আসছেও। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কি বুঝতে পারছে না যে এখনও 'পায়ে জুতার কোন পেরেক খোঁচাচ্ছে?' এটা চিহ্নিত করতে না পারলে কিন্তু পুরো পেরেক পায়ে ঢুকে যেতে পারে এবং তা ডেকে আনতে পারে প্রাণঘাতী ধনুষ্টঙ্কার ব্যাধি।
লেখাটি শেষ করব ১৯৭৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কাজল ব্যানার্জি (এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক) সম্পাদিত 'দেখা পেলেম ফাল্গুনে' সংকলনে মৃণাল সরকারের 'সরকার মুজিব বিন' ছদ্মনামে লেখা কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করে : এই সেদিনও তো রাজ্য ছিল/ সোনার সংসার ছিল/ পাণ্ডবেরা রাজা ছিল/ হায়! যুধিষ্ঠির চলে গেলে/ ছারখারে ছাই হয় সোনার সংসার।
ছাই হওয়া সোনার সংসার ফিরিয়ে আনার কাজ কিন্তু মোটেই সহজ নয়।

অজয় দাশগুপ্ত :সাংবাদিক

হীরক রাজার দেশে ‘মূর্খতার মচ্ছব’ মতিয়া চৌধুরীর মহা মহা আবিষ্কার আ ব দু ল হা ই শি ক দা র - আমার দেশ

প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের মনের মধ্যে কী ছিল জানি না। কিন্তু তাদের আয়োজিত ‘পঞ্চদশ সংশোধনী ও বর্তমান রাজনীতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, এই পঞ্চদশ সংশোধনী বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ‘মুদ্রিত মূর্খতা’। বলেছেন, ‘এটি শাসক শ্রেণীর বিবেক প্রতিবন্ধিতা, আপসকামিতা ও মোনাফেকির দলিল।’ এ জন্যই বোধকরি তারা বলেছেন, ‘এটিকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যাবে না। বরং ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে অতীতের শাসক শ্রেণীর নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেখাতেই এটিকে তুলে রাখতে হবে। দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থে, গায়ের জোরে পঞ্চদশ সংশোধনী করা হয়েছে।’
এই সংগঠন ও বক্তারা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কিংবা মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মতো ভয়ানক বিষাক্ত বাক্যবাণ বা মামলা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন কি না জানি না। হলেও অবাক হতাম না। কারণ পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর একদিকে বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার দরোজা রুদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে শাসক দল, বিশেষ করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা হয়ে পড়েছেন ভয়াবহ রকম মারমুখী। অস্থির, অসহিষ্ণু এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ।
চোখের সামনের ভদ্রতার পর্দা বলে এখন আর কিছু নেই। লাগামমুক্ত কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়িয়ে, যার যা খুশি তারা বলে যাচ্ছেন। যে যেভাবে পারেন মুখ ও জিহ্বার ঝাল মেটাচ্ছেন; ধার পরীক্ষা করছেন। এত যে বৃষ্টি হচ্ছে তবুও বর্তমান সরকার ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মাথা কিছুতেই ঠাণ্ডা হচ্ছে না। থামছে না অতিকথন। যেন চলছে গালাগাল আর মূর্খতার প্রদর্শনী। দেশে যেন হচ্ছে মচ্ছব। মূর্খতার মচ্ছব।
সে জন্যই যে যাই বলুক, কুচ পরোয়া নেই। চোয়ালবাজি বিরতিহীনভাবেই চলছে। এক মন্ত্রী বলছেন, একদিন বাজারে যাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে বাঁচাল বাণিজ্যমন্ত্রী আবিষ্কার করলেন ‘কম খান’ তত্ত্ব। ব্যর্থ, অথর্ব অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারের নিঃস্ব-রিক্ত ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীকে ফট করে বলে বসলেন ফটকাবাজ।
আমার খুব ইচ্ছে করছিল আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী যে দারুণ একটা তত্ত্ব জাতিকে উপহার দিয়েছেন সে জন্য তাকে পিঠে চাপড়ে দেব। কিন্তু বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং ওবায়দুল কাদের সাহেবের ‘কথা কম কাজ বেশি’ কিংবা ‘জাতির সঙ্গে তামাশা বন্ধ করুন’ শুনে মন খারাপ করে ফেলেছি।
প্রাচীন পণ্ডিতরা বলতেন, আমরা সত্যি হতভাগা। আমরা গুণের কদর করতে জানি না। গুণীজনকে সম্মান দিতে পারি না। সেই কথাই আবার সত্য হলো। নইলে ফারুক খানের এই আবিষ্কারের জন্য তার মতবাদ মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, কিংবা মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারার মতো সাদরে গৃহীত হতো।
কত কষ্ট করে দেশ ও জাতির জন্য দিন-রাত খেটেখুটে, আহার নিদ্রা হারাম করে মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী আর্কিমেডিসের মতো ইউরেকা ইউরেকা বলে আবিষ্কার করলেন এই ‘কম খান তত্ত্ব’। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো, টমাস আলভা এডিসনের মতো, রাইট ব্রাদার্সের মতো ফারুখ খানের এই আবিষ্কার পুষ্পচন্দন ধূপ ধুনা দিয়ে বরণ করার বদলে তার একটা স্টাচু রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে স্থাপনের বদলে আমরা সবাই মিলে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এত বড় একটা আবিষ্কারের মহিমাকে ধুলায় মিলিয়ে দিচ্ছি।
বলা হচ্ছে এরপর তিনি হয়তো বলবেন, কম কাপড় পড়ুন, উলঙ্গ থাকুন। কত বড় অন্যায়!
দুই.
ফারুক খানকে একটা গণসংবর্ধনা দেয়ার ইচ্ছে থাকলেও এখন আরেক আবিষ্কারের সামনে জাতি বিস্মিত, বাকরুদ্ধ। এত আনন্দ সহ্য করা যায় না। আসলে আমাদের বর্তমান সরকারের মধ্যে প্রতিভার ছড়াছড়ি। আর আমরা হলাম ভৌগোলিকভাবে ভাঙনপ্রবণ মৃত্তিকার মানুষ। বন্যার পর আসে ঝড়। ঝড়ের পরে আসে গোর্কি। একটা নিয়ে হৈচৈ শুরু করার আগেই শুরু হয়ে যায় আরেকটি। ফলে আবিষ্কারের পর আবিষ্কারের ধাক্কায় আমাদের জীবন হয়ে পড়েছে টলমল। কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে কথা বলি!
ফারুক খান, আবুল মাল আবদুল মুহিত ও কামরুল ইসলামকে টেক্কা দিয়ে আবার আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। মতিয়া আপার দ্বিতীয় মহা মহা আবিষ্কার প্রথমবারের মতো অবমুক্ত হয়েছে গত ১০ আগস্ট, স্বাধীনতা চিকিত্সা পরিষদের এক সমাবেশে। তিনি তার আবিষ্কার উপস্থাপন করে বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ২২ হাজার রাজাকারকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তারপর রাজাকারদের পুনর্বাসনের জন্য সব ব্যবস্থা করেন।’
তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে তার আবিষ্কারের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করে বলেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের কখনোই ক্ষমা করেননি। তাদের ক্ষমা করেছেন জিয়াউর রহমান।
মতিয়া আপার এই আবিষ্কারে নিশ্চয়ই সরকারি মহলে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ‘জিয়া উচ্ছেদ প্রকল্পে’ এই আবিষ্কার নতুন প্রাণশক্তি জোগান দেবে সন্দেহ নেই।
এর আগেও মতিয়া আপা আবিষ্কার করেছিলেন, জিয়া মুক্তিযুদ্ধ করলেও মন থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তার বক্তব্য পড়ে চারদিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। আমরাও তখন বলেছি, সত্যি এটা একটা দারুণ আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হলো, মতিয়া আপার ‘রুহানি ফয়েজ’ হাসিল হয়েছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার দেখাই হয়নি। জিয়া যখন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছেন, তখন মতিয়া আপা কোথায় ছিলেন আল্লাহ পাক জানেন, আমরা জানি না। জিয়ার নেতৃত্বে কোদাল হাতে সিপিবি ও ন্যাপসহ সবাই যখন দেশ গঠনে খাল কাটা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল, তখন মতিয়া আপা কোদাল ধরেছিলেন কি না আমরা জানি না, আল্লাহ জানেন। তারপর জিয়ার শাহাদাত প্রাপ্তির ৩০ বছর পর অনুকূল বাতাসে মোড়ক খুলে গেল তার আবিষ্কারের।
রুহানি ফয়েজ হাসিল ছাড়া দূরের একজন মানুষের মনের খবর জানার আর কোনো পথ নেই। তেমন যন্ত্র আজও কোথাও পাওয়া যায়নি। ফলে সঙ্গত কারণেই আমার মতো অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, হজরত রাবেয়া বসরির পর আর একজন মহিলা আউলিয়া পাওয়া গেল। যিনি যে কারও মনের কথা বলে দিতে পারেন। এমনকি মৃত মানুষের মনের খবরও তার অজানা নয়। কী হতে পারে তার সম্ভাব্য নাম, ‘মতিয়া বসরী’ নাকি ‘মতিয়া শেরপুরী’?
বিষয়টিকে হাল্কা করে দেখার উপায় নেই। রীতিমত ভারী। তখনই আমাদের মনে হয়েছিল এই যে রুহানি শক্তি, তা পারমাণবিক শক্তির মতোই জাতির বৃহত্তর কল্যাণে লাগানো যেতে পারে। তাকে উত্সাহ দিলে তিনি আরও অনেক নতুন নতুন বাণী জাতিকে শোনাতে পারবেন। প্রথম আবিস্কারে হয়তো বিপুল উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন। সেই উত্সাহ ও অনুপ্রেরণার ফসলই হলো তার দ্বিতীয় আবিষ্কার। জিয়া ২২ হাজার রাজাকারকে ক্ষমা করেছিলেন। কারণ জিয়ার পিতা-মাতার কবর পাকিস্তানে। পাকিস্তানের কাছে তার ঋণ আছে।
এরপর হয়তো মতিয়া আপা বলবেন, পাকিস্তান যেহেতু পশ্চিম দিকে, অতএব পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজ পড়া যাবে না। কারণ তার মধ্যে পাকিস্তান প্রীতি প্রকাশ পেতে পারে।
তিন.
যার পিতা-মাতার কবর পাকিস্তানে নয়, গোপালগঞ্জের টুঙ্গী পাড়ায়, সেই মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা প্রসঙ্গে ‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ; পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর’ গ্রন্থে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীকুল শিরোমণি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘১৯৭৩ সালে ডিসেম্বর মাসে বিজয় দিবসের আগে বঙ্গবন্ধু আমাকে কলকাতা থেকে ডেকে পাঠান।... তিনি আমাকে একান্তে ডেকে নিলেন। বললেন, এখনই একটি সরকারি ঘোষণার খসড়া তোমাকে লিখতে হবে। পাকিস্তানিদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা দণ্ডিত ও অভিযুক্ত হয়েছেন, সবার জন্য ঢালাও ক্ষমা (জেনারেল অ্যামনেস্টি) ঘোষণা করতে যাচ্ছি। বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম, পালের গোদাদের ছেড়ে দেবেন।... মুজিব হেসে বললেন, না, তা হয় না। সবাইকেই ছেড়ে দিতে হবে। আমার এ আসনে বসলে তোমাকেও তাই করতে হতো।’ যথারীতি এ লেখার মধ্যেও সাল-তারিখ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।
শেখ মুজিব ‘১৯৭২ সালের বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ (পিও নং ৮, ১৯৭২ সালে) বলে আটক ও সাজা ভোগ করছিলেন যারা তাদের সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন ১৯৭২ সালের ৩০ নভেম্বর। অর্থাত্ সব রাজাকারকে ক্ষমা করে দেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। আর যুদ্ধাপরাধীদের তিনি ক্ষমা করেন ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল।
দালাল আইন করলেন শেখ মুজিব। দালাল আইন বাতিল করে রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন শেখ মুজিব। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করলেন শেখ মুজিব। তারপরও ইতিহাসের এত বড় সত্যকে পায়ের নিচে চাপা দিয়ে মতিয়া আপা তারস্বরে চিত্কার করে বলছেন, জিয়া ২২ হাজার রাজাকারকে ক্ষমা করেছিলেন।
চার
মতিয়া আপাসহ সব মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে টেক্কা দিয়েছেন ফখরুদ্দীন ও মইনউদ্দিনের পেয়ারের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ, টি, এম শামসুল হুদা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চলমান সংলাপ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, আমাদের সংলাপ হলো একটা কার্টেসি।
অর্থাত্ লোক দেখানো সৌজন্য মাত্র। কারণ তার ভাষায় ‘আমরা যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারি।’
তার কথা শুনে গুপী গাইন বাঘা বাইনের মতো বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ‘দেখোরে নয়ন মেলে, দেখোরে জগতের কী বাহার।’ কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।
পাঁচ.
বাংলাদেশ যেন কয়েক বছরের মধ্যে সত্যজিত্ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ পরিণত হয়েছে। অথবা হীরক রাজার দেশের দ্বিতীয় পর্বের অভিনয় চলছে এখন।
হীরক রাজা যা বলবে তাতেই সবাইকে ধন্য ধন্য করতে হবে। নইলে যন্ত্রর মন্ত্রর ঘরে ঢুকিয়ে মগজ ধোলাই করে দেয়া হবে। বলতে হবে, ‘যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান।’ কৃষক বলবে, ‘ভরপেট না-ও খাই, রাজ কর দেওয়া চাই।’ শ্রমিককে বলতে হবে, ‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ।’
স্কুল পাঠশালা বন্ধ করে বলতে হবে, ‘লেখাপড়া করে যেই, অনাহারে মরে সেই।’ ‘বিদ্যালাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান।’ ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’
হীরকের এই অদ্ভুতুড়ে দুঃশাসনের সহায়ক তার মন্ত্রী, বৈজ্ঞানিক, সভাকবি, জ্যোতিষী, তার মগজ ধোলাই হওয়া সৈন্যদল/তারপরও কি শেষ রক্ষা হলো, ‘যারা তার ধামাধারী, তাদেরও বিপদ ভারী।’
এক পণ্ডিত মশাই আর গুপী, বাঘা মিলে তচনচ করে হীরকের নির্যাতনের রাজত্ব। মগজ ধোলাই হওয়া কলের পুতুলের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিরে এলো হুঁশ। তারা পথের দিশা পেয়ে ছুটল হীরকের বিশাল স্টাচু ভাঙতে। আর সেই দুষ্টু ছেলেটা, যে বাটুল দিয়ে ভেঙে দিয়েছিল রাজ মূর্তির নাক—সেও।
শেষ পর্যন্ত স্বয়ং হীরক রাজাও ছুটল তার মূর্তি ভাঙতে। মূর্তি উপড়ানোর জন্য লাগানো দড়ি ধরে সেও প্রাণপণ টানতে টানতে সবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইতে লাগল, ‘দড়ি ধরে মার টান, রাজা হবে খান খান।’
হীরক রাজার কাণ্ডজ্ঞান ফিরেছিল। কারণ সেখানে গুপী গাইন আর বাঘা বাইনের মতো ভালো মানুষরা এসে জুটেছিল। পেয়েছিল পণ্ডিত মশাইয়ের মতো নিবেদিতপ্রাণ জনসেবক, সমাজকর্মী। কিন্তু আমরা কোথায় যাব? কোথায় পাব গুপী গাইন বা বাঘা বাইনের মতো মানুষ। কোথায় পাব পণ্ডিত মশাইয়ের মতো দেশদরদী। আমাদের অচলায়তনের দ্বার ভাঙবে কে? কোথায় আমাদের অরিন্দম?
ছয়.
’৭১-এর কথা। পাক আর্মি ঢুকেছে একটি গ্রামে। দেখল একজনের উঠোনে বেশ কিছু মোরগ-মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর্মির কমান্ডার জিজ্ঞেস করল, এই মুরগা কা মালিক কৌন হ্যায়?
উপস্থিত লোকজনের মাঝ থেকে ভয়ে ভয়ে তিনজন এগিয়ে এলো, হুজুর আমরা হ্যায়।
তাদের ধারণা ছিল এরা হয়তো মোরগ-মুরগিগুলো চাইবে। ভেবেছিল চাওয়া মাত্র দিয়ে প্রাণ বাঁচাবে।
কমান্ডার প্রথম জনকে ডাকল, ‘এই তোম মোরগা কো কেয়া খাওয়াতা হ্যায়?
লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ‘হুজুর ধান-চাল খাওয়াতা হ্যায়।’
রেগে আগুন হয়ে উঠল কমান্ডার, ‘কেয়া, পাবলিককো খানা তোম মুরগা কো খাওয়াতা হ্যায়। এই আদমি কো দশ লাথ মারো। লাথি খেয়ে সেতো পড়ি মরি চিত্কার।
এবার দ্বিতীয়জনকে কমান্ডার বলল, ‘এই তোম কেয়া খাওয়াতা হ্যায়?
ভয়ে নীল হয়ে যাওয়া লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলল, হুজুর আমি আটা খাওয়াতা হ্যায়! বলে হে হে করতে লাগল।
আবার রেগে আগুন কমান্ডার ‘এই শালে লোক, কেয়া বলতা হ্যায়? আর্মি কো খানা তোম মোরগা কো খাওয়াতা হ্যায়! এই লে যাও, এ শালাকে বিশ লাথি মারো।’
কমান্ডার এগিয়ে গেল সব শেষজনের দিকে, ‘এই তোম কেয়া খাওয়াতা হ্যায়?’
লোকটা নির্বিকারভাবে বলল, হুজুর হামি কিছুই খাওয়াতা হ্যায় না।
কেয়া?
হ হুজুর। প্রতিদিন সকালে আমি মোরগাকো ডাকতে হ্যায়। মোরগা মেরা পাঁচ আইতা হ্যায়। আইলে আমি প্রতি মোরগারে একটা করে টেকা দিতা হ্যায়। ওরা টেকা লাইয়া যাইয়া, যখন যা মন চায় কিনা কিনা খায়।
কমান্ডার খুব খুশি। বলল, তুম ভি সাচ্চা আদমি হো।

পুলিশ ও র‌্যাবের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সরকারও উদ্বিগ্ন পারভেজ খান ও এস এম আজাদ - কালের কন্ঠ

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশই ভঙ্গ করছে আইন। তারা একের পর এক ঘটাচ্ছে বিতর্কিত ঘটনা। বেড়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সহায়তা, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া, মাদক ব্যবসায় মদদ দেওয়া, থানায় বন্দির ওপর নির্যাতন, গুম, গণপিটুনিতে সহায়তা করাসহ নানা অভিযোগ। তাদের আচরণে বিব্রত সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহল। গুটিকয়েক পুলিশ সদস্যের আচরণ জন্ম দিচ্ছে হাজারো প্রশ্ন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে। আর তাই সরকারের এখন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের বেকায়দায় ফেলার কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কি না! এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার পুলিশের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে থলের বেড়াল।
বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু পুলিশ নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করায় পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। বর্তমান সরকার এ থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পুলিশ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, 'দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণমাধ্যমে যাদের নাম আসছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুরু পাপে লঘু নয়, গুরু পাপে গুরুদণ্ডই দেওয়া হবে।' গত বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোক দিবস উপলক্ষে ওলামা লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি সাভারের আমিনবাজারে গণপিটুনিতে ছয় ছাত্র হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরের ওপর পুলিশি নির্যাতন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে তরুণ মিলনকে গণপিটুনিতে হত্যা, রাজধানীর দয়াগঞ্জ থেকে তিন তরুণকে ডিবি পরিচয়ে অপহরণের পর হত্যা, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার নওগাঁর ধামইরহাটে পুলিশের লাথিতে এক বৃদ্ধার মৃত্যুসহ কয়েকটি ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনারই বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া দরকার। দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বেড়েছে ন্যক্কারজনক আচরণ : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ জুলাই খিলগাঁও থানার সিভিল টিমের এসআই আলম বাদশা ও এএসআই শাহিনুর রহমান সেগুনবাগিচা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। অভিযোগ উঠেছে, থানায় তাঁকে ডাকাতি মামলার আসামি সাজিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে চালানো ওই নির্যাতনে হাত-পা থেঁতলে যায় কাদেরের। তাঁর পায়ে চাপাতি দিয়ে আঘাত করেন স্বয়ং থানার ওসি। আহত অবস্থায়ই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে আবদুল কাদেরকে আদালতে হাজির করেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে আদালত খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিন, সিভিল টিমের কর্মকর্তা এসআই আলম বাদশা ও এএসআই শাহিনুর রহমানকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন।
কাদেরের ঘটনার মতো দেশব্যাপী তোলপাড় হয়েছে গত ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের আরেকটি ঘটনায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এইচএসসি পরীক্ষার্থী লিমনকে র‌্যাব-৮-এর একটি দল আটক করে বাম পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় লিমনের একটি পা কেটে ফেলতে হয়। গত ১৮ জুলাই সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নিহত ছয় ছাত্রের বেঁচে যাওয়া সঙ্গী আল-আমিনের ভাষ্য, ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিল। এই ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকাকে কেন অবৈধ ও বে-আইনি ঘোষণা করা হবে না, তা সরকারের কাছে জানতে চান হাইকোর্ট। আরো অভিযোগ রয়েছে, বড়দেশীতে পুলিশকে ম্যানেজ করেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে মাদক ব্যবসা।
সাভারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নিরপরাধ কিশোর সামছুদ্দিন মিলনকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, খালাতো বোনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে মিলনকে এলাকার কয়েকজন ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এরপর পুলিশ তাঁকে ডাকাত আখ্যায়িত করে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছেড়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে। একটি টেলিভিশন চ্যানেল এ ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করলে হৈচৈ পড়ে যায়। এ ঘটনায় ৬ আগস্ট এসআই আক্রাম উদ্দিন শেখ, কনস্টেবল হেমরঞ্জন চাকমা ও আবদুর রহিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ৮ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. রফিক উল্লাহকে ক্লোজ করা হয়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক জরিপ থেকে জানা যায়, গত আড়াই বছরে দেশে গণপিটুনিতে ৩৬৩ জন নিহত হয়েছে। গত সাত মাসে ৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। ডাকাতি সন্দেহে বেশির ভাগ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রহস্যজনক গুম-হত্যায় বিব্রত প্রশাসন : গত ৩১ জুলাই রাজধানীর দয়াগঞ্জ থেকে স্থানীয় তরুণ জুয়েল, রাজীব ও ওয়ার্কশপকর্মী মিজানুর হোসেনকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় কয়েকজন সাদা পোশাকের লোক। ৫ আগস্ট এই তিনজনের মধ্যে দুজনের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরে এবং আরেকজনের ঢাকা-মাওয়া সড়কের পাশে। এ ঘটনার কোনো দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি ডিবি পুলিশ।
গত আড়াই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে এমন বেশ কিছু অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কোনো তদন্তপ্রক্রিয়াই সঠিকভাবে এগোয় না। গত বছরের ১৭ এপ্রিল বাড্ডার কুড়িল থেকে র‌্যাব পরিচয়ধারীরা ঝালকাঠির রাজাপুরের মিজানুর রহমান মিজান, নাজমুল হক মুরাদ ও ফোরকানকে অপহরণ করে। ২৭ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের পেছনে তুরাগ চরে ওই তিনজনের লাশ পাওয়া যায়। ১৮ এপ্রিল গাজীপুর থেকে পুলিশ নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী নূরুল আমিন মাকসুদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। গত বছর কারওয়ান বাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাইদুলকে হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। বিএনপির নেতা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে গত বছরের ২৫ জুন রাতে ফার্মগেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে অভিযোগ করে তাঁর পরিবার। এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। রাজধানী থেকে নিখোঁজ হয় সাবেক যুবলীগ নেতা এবং তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত হোসেন। তার স্ত্রী দাবি করেন, লিয়াকতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দাবি অস্বীকার করে র‌্যাব ও পুলিশ। যেটাই ঘটুক, লিয়াকত এখন পর্যন্ত নিখোঁজ। গত বছর ফার্মগেট এলাকা থেকে সুজন নামের এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করে তাঁর পরিবার। ঘটনা অস্বীকার করেছে পুলিশ। সুজন নিখোঁজ আছেন এক বছর।
সমালোচনায় বেপরোয়া আচরণ : গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার রজনীগন্ধা মার্কেটের স্বর্ণালী জুয়েলার্সে কথিত চুরির অভিযোগে নিঙ্ন নামের এক দোকান কর্মচারীকে গ্রেপ্তারের পর অমানুষিক নির্যাতন করে কাফরুল থানা পুলিশ। নিঙ্ন এখন জামিনে মুক্ত হলেও পঙ্গুপ্রায়। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে অভিযুক্ত এসআই কামরুল ইসলামকে 'মৃদু শাস্তি' হিসেবে দারুস সালাম থানায় বদলি করা হয়। সবই ঘটেছে যে ওসির নির্দেশে তিনি বহালতবিয়তে আছেন। কেউ কেউ বলছে, ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার জন্য মালিক ৭৫ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি গেছে উল্লেখ করে একটি মিথ্যা মামলা করেছেন। মালিকের ঘনিষ্ঠজন স্থানীয় একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
গত ৬ জুলাই হরতাল চলাকালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়। এরপর আলোচনার শীর্ষে পেঁৗছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। ঘটনাটিতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, একসময়ের ছাত্রলীগ ক্যাডার হারুন পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে নয়, তাঁর রাজনৈতিক গুরুদের ইশারাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের ওপর। এতে সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ প্রশাসন ও সরকার।
জানা গেছে, গত বছর ১৪ নভেম্বর ফার্মগেট খামারবাড়ী পুলিশ বঙ্রে কাছে দৈনিক কালের কণ্ঠের ক্রীড়া প্রতিবেদক সামীউর রহমানকে পিটিয়ে জখম করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসান দায়িত্বরত সার্জেন্ট রাশেদুল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। ওই সময় খামারবাড়ী এলাকায়ই এক মাসের ব্যবধানে আরো তিন সাংবাদিককে নির্যাতন করে পুলিশ। এসব ঘটনায় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে পুলিশের। অথচ আজ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সমালোচনার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার উমার ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে মাদকবিরোধী এক অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশের লাথিতে আমেনা বেওয়া (৮৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়। গ্রামবাসী ধামইরহাট থানার এসআই মোহসীন আলীকে আটক করে। পুলিশের অন্য সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করতে সাতটি ফাঁকা গুলি ও দুটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে নওগাঁর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আহমারুজ্জামান জানিয়েছেন, পুলিশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে বৃদ্ধা মারা যান।
গত বছরও এমন পরিস্থিতি হয় : মাঠপর্যায়ে র‌্যাব ও পুলিশের আচরণ বারবার বেকায়দায় ফেলছে প্রশাসন ও সরকারকে। গত বছরের মাঝামাঝিতে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনজনের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় চরম বিপাকে পড়ে প্রশাসন, সরকার।
গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ হেফাজতে মারা যায় রিকশাচালক মানিক। ২৯ জুন অটোরিকশাচালক বাবুল গাজীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে রমনা থানার এসআই আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে। ৩১ জুন গুলশানে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ২ জুলাই গাবতলী-আমিনবাজার সেতুর পাশ থেকে উদ্ধার হয় মজিবুর রহমান নামের এক পরিবহন শ্রমিকের লাশ। অভিযোগ ওঠে, দারুস সালাম থানার তিন দারোগা হেকমত, মশিউর ও সায়েম ৫০ হাজার টাকা চাঁদার দাবিতে পিটিয়ে ও চুবিয়ে হত্যা করে মজিবুরকে। এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অফিসাররা কয়েক দিনের মাথায় চাকরিতে আবার বহাল হন। মজিবুরের মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত এসআই হেকমত পল্লবী থানায় কর্মরত। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ_তিন শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় তিন নারী-পুরুষকে থানায় দুই দিন আটকে নির্যাতন করার।
বিশ্লেষকরা যা বলেন : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, 'যে পুলিশ প্রশাসন দেবে জনগণকে নিরাপত্তা, সেই তাদের দ্বারা একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা কারোরই কাম্য নয়। এসব ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অতীতে এ ধরনের ঘটনায় বিচার না হওয়ার কারণে আইন ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে।' ড. মিজানুর রহমান আরো বলেন, একের পর এক পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আলামতও হতে পারে। পুলিশের সব সদস্যই সরকারের মঙ্গল চান_এমনটি নাও হতে পারে। অতীতে অনেক পুলিশকে দেখেছি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। আর তাই এখন যেসব ঘটে চলেছে তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল হাকিম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাদের দেশের মানুষের পুলিশ সম্পর্কে ধারণা সব সময়ই নেতিবাচক। তারা এখন পর্যন্ত এমন কিছু করতে পারেনি যে জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখবে। পুলিশের দ্বারা লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও আইন ভাঙার ঘটনা ঘটলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখলেই তা বোঝা যায়। পুলিশে রাজনীতিকরণ এর একটি বড় কারণ। গায়ে ইউনিফর্ম ও হাতে অস্ত্র পেয়েই নিজেকে তারা ক্ষমতাধর মনে করে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনেও সংস্কার প্রয়োজন।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পুলিশকেই তাদের কাজের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহ্য আর ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হবে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা নিতান্তই দুঃখজনক। পুলিশ প্রবিধান হোক, মানবাধিকার আইন হোক আর দেশের সংবিধানই হোক, সবখানেই বন্দিকে মারধর করা যাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। পুলিশ কোনো ক্ষমতাবলেই একজনকে তার হেফাজতে নিয়ে মারধর করতে পারে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং পুলিশের সাবেক আইজি এ এস এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ষড়যন্ত্র, বিরোধ যাই থাকুক না কেন নিজেদের ভেতরের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে আগে। বিভাগীয় পর্যায়ে চেইন অব কমান্ড এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাঁদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নিলে বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।'
পুলিশের আইজি খন্দকার হাসান মাহমুদ বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, অপরাধ অপরাধই। পুলিশকে তদন্তের মাধ্যমে এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। মারধর করে তথ্য আদায়ের কখনোই আইনসম্মত নয়। বিচ্ছিন্ন যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সেটা কেউই কামনা করে না। সংশ্লিষ্ট (অভিযুক্ত) পুলিশদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, এর পেছনে সরকার বা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য কোনো মহলের চক্রান্ত আছে কি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বদলি, পদোন্নতি, চাকরিচ্যুতি, কথিত ভালো স্থানে পদায়ন_সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিকভাবে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাগজে স্বাক্ষর করেন মাত্র। এটা শুধু বর্তমান সরকারের বেলায় প্রযোজ্য নয়, অতীতের সব সরকারের বেলাতেও ছিল। পুলিশ বিভাগে যাঁদের বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির কাছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির কাছে, তাঁরা দাপট দেখাতে ওস্তাদ। তাঁরা তোয়াক্কা করেন না সিনিয়র কাউকে। আর এই গোষ্ঠীভুক্তদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বা উলি্লখিত মন্ত্রীদের পরিচয় বা কোনো সাপোর্ট থাক বা না থাক, তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই এলাকার লোক হওয়ার কারণেই অনেকটা সমীহ করে চলেন। ভাবখানা এমন যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকার বা প্রধানমন্ত্রীর এলাকার লোক। অতএব তাঁর কথা না রাখলে বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাখোশ হয়ে উল্টো তাঁরই ক্ষতি করতে পারেন। ব্যবস্থা না নিয়ে বরং সহায়তা করলে মন্ত্রী মহোদয়রা আরো খুশি হতে পারেন। দেশে এ রকম মনোভাবাপন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি। আর এসবের কারণে যেটা হয়, সেটা হচ্ছে পুলিশে চেইন অব কমান্ড বলে কিছুই থাকে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে ভালো কিছুই ঘটবে না। ভালো কিছু আশা করাটাও হবে বোকার স্বর্গে বাস করা।

তুরস্কের রাজনীতিতে বাঁকবদল! ফখরুজ্জামান চৌধুরী

দ্বিমহাদেশীয় রাষ্ট্র তুরস্কের ৯৭ শতাংশ এশিয়ায়, আর মাত্র ৩ শতাংশ ইউরোপে অবস্থিত হলেও পোশাকে, আচার-আচরণে তুর্কিরা যতটা ইউরোপীয়, তার চেয়ে বেশি এশীয় নয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর মিত্রশক্তি তুরস্কের বড় একটা অংশ দখল করে নিলে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক নামের তরুণ তুর্কি সামরিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একদল সেনা কর্মকর্তা মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বিজয়ী হয়ে ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্র_তুর্কি জমহুরিয়া; এবং কামাল আতাতুর্ক প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
তুরস্ক গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক প্রজতান্ত্র রাষ্ট্র, যার রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য। ন্যাটো শক্তির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য দক্ষিণ আটলান্টিক জোটের সেনাবাহিনীতে সেনাসংখ্যার হিসাবে তুরস্কের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০০৫ সালের শুরু থেকে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করার জন্য দেনদরবার করলেও এখন পর্যন্ত সহযোগী সদস্যপদ থেকে সদস্যপদে উন্নীত হতে পারেনি। এ জন্য অবশ্য ইউরোপীয় দেশগুলোর একগুঁয়েমিকে দায়ী করা হয়।
তুরস্কের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া নির্বাচিত সরকারের পক্ষেও ক্ষমতা গ্রহণ তুরস্কে অকল্পনীয়।
কিন্তু অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক এক ঘটনার ফলে তুরস্কের এতকালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
গত ২৯ জুলাই তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল ইসাক কোসান এবং বিমান ও নৌবাহিনীপ্রধান একযোগে পদত্যাগ করলে দেশটিতে সংকটের আভাস পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়েছিল, এর ফলে দেশটিতে সেনাবাহিনী ও সরকার অনিবার্যভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। তিন বাহিনীর ত্রয়ীর এই পদত্যাগের কারণও সংকটের ইঙ্গিতবহ। বেসামরিক সরকারকে উৎখাতের অভিযোগে একদল পদস্থ সেনা কর্মকর্তার বিচারের কারণেই এই পদত্যাগ।
একটি সেনা অভ্যুত্থান অত্যাসন্ন_এমন ধারণা যাঁরা পোষণ করতেন, তাঁরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে আছেন এবং আধুনিক তুরস্কের সেনা নেতৃত্ব প্রথমবারের মতো বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করেছে বলে মনে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি তেমনটাই হয়, তাহলে এর পুরো কৃতিত্ব পাবেন প্রধানমন্ত্রী এরদোগান, যিনি ১২ জুন তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এরদোগান ইতিমধ্যে কুর্দি, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমস্যার সমাধান করেছেন। তুরস্কের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করার পর এখন তাঁর দৃষ্টি সামরিক বাহিনীর প্রতি।
এতকাল তুরস্কবাসী রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে মুখ্য ভাবলেও এখন মনে হয় দেশটির রাজনীতিতে বাঁকবদল ঘটেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করার ফলে দেশবাসীর কাছে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি এখন উজ্জ্বল, তাঁর ক্ষমতাও অনেক সংহত। সেনানায়কদের সে কারণেই হয়তো এমন নমনীয় অবস্থান এবং সেনাপ্রধানের পদত্যাগের পরপরই কালবিলম্ব না করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল নেজদেত ওজালের নিযুক্তি প্রধানমন্ত্রীর ঘটনাপ্রবাহের ওপরের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পরিচায়ক।
২৯ জুলাইয়ের পদত্যাগ-পর্বকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল দেখেন তুরস্কে চলমান সমান্তরাল ক্ষমতা-ব্যবস্থার অবসান হিসেবে। ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি সংক্ষেপে একেপির রাজনৈতিক অভীষ্ট এর দ্বারা অর্জিত হওয়ার পথে।
১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগে জনসাধারণের সামনে উচ্চৈঃস্বরে ইসলামী ভাবধারাসংবলিত কবিতা আবৃত্তি করার অপরাধে কারাভোগকারী এরদোগান ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরই ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে কিংবা নিরপেক্ষ রাখতে প্রয়াসী হন।
প্রথমবার নির্বাচনে জয়ী এরদোগান ও তাঁর একেপি পার্টির অনেকটা সময় কেটেছে ক্ষমতার ভিত মজবুত করার কাজে। নির্বাচনের পর এক বছর তুরস্কের সর্বোচ্চ আইনি প্রতিষ্ঠান কনস্টিটিউশনাল কোর্টের রায়ে ক্ষমতার বাইরে তাঁকে ও তাঁর দলকে থাকতে হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেননি তিনি। ২০০৭ সালে একই আদালত আবদুল্লাহ গুলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দেন। এক বছর পর একই কোর্ট রায় দেন এই মর্মে যে একেপি পার্টি তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি হুমকিস্বরূপ। মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া থেকে বেঁচে যায়।
সেটাই ছিল তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তাদের শেষ শক্তি প্রদর্শনের নজির। ইসলামপন্থী দল হিসেবে বিবেচিত একেপি পার্টির তুরস্কের রাজনীতিতে সর্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের শুরু এই বছর_২০০৭ সাল থেকেই।
মি. গুল প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর একেপি পার্টি দুইবার নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে অনেক সেনা কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, আইনজীবী কারারুদ্ধ হয়ে বিচারের অপেক্ষায় আছেন।
জনগণের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী এরদোগান বর্তমানে এমনই ক্ষমতাশালী হয়েছেন যে দেশকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ থেকে সরিয়ে ধর্মভিত্তিক আদর্শের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। মদ্যপানের ওপর আরোপিত সাম্প্রতিক কড়াকড়ি ব্যবস্থাকে অনেকেই দেখেন এই পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের হিজাব পরার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল দেশকে ইসলামীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
মি. এরদোগান ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি দেশটিকে আরো বেশি গণতান্ত্রিক করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করার পদক্ষেপ নেবেন। তবে এই পরিবর্তন অবশ্যই আনা হবে বিরোধী দলের সমর্থন ও সহায়তায়।
বিরোধী দল শাসনতন্ত্র সংশোধনের ব্যাপারে কতটা সহায়তা করবে, তা এক প্রশ্ন। কারণ ইতিমধ্যে তুরস্কে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের একক সিদ্ধান্তে।
যাঁরা তুরস্কের বর্তমান রাজনৈতিক বাঁকবদলের ব্যাপারে উৎসাহী, তাঁরা সাম্প্রতিককালে দেশটির বিভিন্ন সময়ের ঘটনাপঞ্জির প্রতি দৃষ্টি দিতে পারেন।
দেশের শাসনব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভের ক্ষেত্রে এই ঘটনাগুলো মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে :
* ২০০২ সালে ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি_একেপির নির্বাচনে জয়লাভ।
* ২০০৭, এপ্রিল : সেনাবাহিনী 'ই-মেমোরেন্ডাম' জারির মাধ্যমে হুঁশিয়ার করে দেয়, প্রেসিডেন্ট পদের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তারা হস্তক্ষেপ করবে।
* ২০০৭, মে : একেপি পার্টির আবদুল্লাহ গুলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পার্লামেন্টের অনুমোদন লাভের প্রয়াসকে রুদ্ধ করে রায় দেন কনস্টিটিউশনাল কোর্ট।
* ২০০৮, জুলাই : তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি হুমকি মনে করে একেপি পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে কনস্টিটিউশনাল কোর্টের ব্যর্থ প্রয়াস।
* ২০০৮, জুলাই : সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তরফে গণহারে মামলা দায়ের।
* ২০১০ : কনস্টিটিউশনাল কোর্টের এখতিয়ার পরিবর্তন করতে গণভোটে একেপি পার্টির জয়লাভ।
* ২০১১ : সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তিন বাহিনীর প্রধানের পদত্যাগপত্র পেশ।
তুরস্কের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যা লক্ষণীয় তা হলো, সরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করেছে, যার ফলে জনসমর্থন পেতে তার সুবিধা হয়েছে এবং যেখানে সমর্থন সরাসরি পাওয়া যায়নি, সেখানেও বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি সরকারকে।
সর্বশেষ যা লক্ষণীয় তা হলো, তিন বাহিনী প্রধানের ইস্তফাপত্র দাখিল করার সময় নির্বাচন, যা তাঁদের দেশপ্রেমের পরিচায়ক। তাঁরা পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই। ফলে তুরস্কের মুদ্রামানে কোনো হেরফের ঘটেনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে লিরা তার মুদ্রামান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এবং পরবর্তী সোমবার সাপ্তাহিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার আগেই নতুন সেনাপ্রধানের নিযুক্তির ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগের সপ্তাহের ঘটনাবলির কোনো প্রভাবই পড়ল না।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

Friday, August 12, 2011

বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা বদরুদ্দীন উমর

রাজনৈতিক এবং অন্য কিছু বিষয়ে ইংরেজি দৈনিক Daily Star যে ভূমিকাই পালন করুক, পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশের ওপর সব রকম হামলার বিরুদ্ধে পত্রিকাটি এমন এক জিহাদ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে যা অন্য কোনো জাতীয় পত্রিকায় দেখা যায় না। বনাঞ্চলে গাছ ও জীবজন্তু, পশুপাখি, সরীসৃপ থেকে নিয়ে পাহাড়, জলাশয় সবকিছু এখন দেশজুড়ে যেভাবে চোর-ডাকাত-দুর্নীতিবাজদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হচ্ছে তার বিরুদ্ধে তারা নিয়মিতভাবে বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট প্রকাশ করে বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অবদান রাখছে এই অর্থে যে, দেশের জনগণকে তারা সতর্ক করছে, এই অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে সেটা দেশ ও জনগণকে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে। এ প্রসঙ্গে এখানে এটা প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে, এই পত্রিকাটিসহ পরিবেশ রক্ষার জন্য আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয় নিয়ে সরকারের কাছে অনেক দাবি ও প্রস্তাব পেশ করলেও সরকার মুখে যাই বলুক, কার্যক্ষেত্রে তার বিপরীত কাজ করে লুণ্ঠনজীবী পরিবেশ ধ্বংসকারীদের নানাভাবে প্রশ্রয় ও আশ্রয় দিয়ে লুণ্ঠন কাজে তাদের সহায়তাই করে যাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিজেরাই নিয়মিতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি ও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে!! বন বিভাগ, আইডব্লিউটিএ, রাজউক, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ইত্যাদি সরকারি বিভাগ, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে এর রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়। ৮ আগস্ট ২০১১ তারিখের Daily Star-এর প্রথম পৃষ্ঠায় এক সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, কীভাবে কামরাঙ্গীরচরের কাছে বুড়িগঙ্গার ওপর র্যাব-১০ তার স্থায়ী অফিস ও স্টাফ কোয়ার্টারের কতগুলো ভবন তৈরির জন্য নদী ভরাট করছে। এর আগে ২০১১ সালের ১৫ মে তারা ‘বুড়িগঙ্গার ওপর র্যাব অফিস’ নামে একটি সচিত্র রিপোর্ট ছেপেছিল, কিন্তু তাতে কোনো কাজ যে হয়নি তার প্রমাণ র্যাবের উপরোক্ত প্রকল্পের কাজ এখন পুরোদমে এগিয়ে চলেছে!

একদিকে এই অবস্থা এবং অন্যদিকে যমুনা থেকে বুড়িগঙ্গায় পরিষ্কার পানি এনে ফেলার এক বিরাট ব্যয়বহুল প্রকল্প কার্যকর করার ঘোষণা এখন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে ৯৪৫ কোটি টাকা। (Daily Star, 8-8-2011) এই প্রকল্প অনুযায়ী যমুনাকে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে তুরাগ-বংশী-পুংলী নদী ও তারপর ধলেশ্বরীর মধ্য দিয়ে। এই উদ্দেশ্যে গত মাসে প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ পরিচালিত হবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্বারা। একাধিক পর্যায়ে এই সংস্থাটি বিভিন্ন নদী ও খালে ১৬২.৫ কিলোমিটার ড্রেজিং করবে। ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’ (Buriganga River Restoretion) নামে এই প্রকল্পের কাজ ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এর কাজ শুরু হতে এক বছর দেরি হওয়ায় তা শেষ হতেও কিছু বিলম্ব হবে।

আপাতদৃষ্টিতে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারের এই কর্মসূচি বড়ই আশা ও সুখের ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশের শাসন পরিচালনার ভার যাদের হাতে তারা এই প্রকল্পের কী পরিণতি ঘটাবে সে বিষয়ে ঘোর সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে। একথা বলার কারণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ পর্যন্ত যা দেখা গেছে তাতে সরকারের কাজ ও কথার মধ্যে যেমন কোনো মিল নেই, তেমনি এদের কোনো কাজের শুরু ও শেষের মধ্যে হাজার রকম গর্ত। এসব গর্তে পড়ে অনেক প্রকল্পেরই সমাধি হয়, কিন্তু প্রকল্পের সমাধি হলেও চুরি-দুর্নীতির মাধ্যমে এসব প্রকল্পের টাকা সংশ্লিষ্ট লোকদের পকেটে প্রবেশ করে। এই লুটপাটে ক্ষমতাসীন সরকারের লোক, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ঠিকাদার থেকে নিয়ে সম্পর্কিত সব রকম লোকই ভাগ বসায়। কাজেই ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার’ প্রকল্প ঘোষণা, এর জন্য টাকা বরাদ্দ ও এর কাজ শুরু হলেও এর পরিণতি কী হবে সে নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছুই নেই।

একথা বলার বিশেষ কারণ এই যে, বাংলাদেশে এখন লুটপাটের সব থেকে বড় ক্ষেত্র হলো জমি। এই জমি লুটপাটের সঙ্গে সম্পর্কিত হলো, নদীর পানি মেরে জমি তৈরি। এভাবেই বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি ছোটবড় নদী, লেক, খাল-বিলসহ সব ধরনের জলাশয় এখন ভূমিদস্যুদের দ্বারা এমনভাবে দখল হয়ে চলেছে যাতে শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, এসব জলাশয় পুনরুদ্ধারও দেশের পরিবেশ ও জনগণকে রক্ষার জন্য আবশ্যক। প্রথমত বলা দরকার যে, নদী পুনরুদ্ধার বলতে শুধু নদীর দূষিত পানি শোধন বা দূষিত পানির সঙ্গে কিছু পরিষ্কার পানি যোগ করে দূষণ কমিয়ে আনা নয়। নদী পুনরুদ্ধারের অর্থ নদীকে মেরে জমি তৈরির যে তাণ্ডব অবাধে দেশজুড়ে চলছে, এমনকি সরকারের নাকের ডগায় ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতে চলছে, তা এই মুহূর্তে বন্ধ করা। কারণ নদী যদি তার স্বাভাবিক প্রস্থ হারিয়ে ক্রমাগত সঙ্কীর্ণ হতে থাকে তাহলে বড় নদী থেকে পরিষ্কার পানি এনে তার সঙ্গে যুক্ত করলেও শেষ পর্যন্ত নদীর প্রাণ রক্ষা করা যাবে না। কীভাবে সরকার ও সরকারি সংস্থাগুলো পর্যন্ত ভূমিদস্যুদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নদীকে ডাঙ্গায় পরিণত করে নদীর সর্বনাশ করছে এর একটি দৃষ্টান্ত প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এছাড়া এই সর্বনাশের আরও হাজার দৃষ্টান্ত দেশময় ছড়িয়ে আছে। কাজেই এই সমস্যা যদি ‘নদী পুনরুদ্ধার’-এর সমস্যার সঙ্গে যুক্তভাবে না দেখা যায় ও সেই অনুযায়ী কাজ না করা যায়, তাহলে শুধু অন্য নদী থেকে পানি আমদানি করে কোনো নদীকেই প্রকৃতপক্ষে ‘পুনরুদ্ধার’ করা সম্ভব নয়। এর ফলে শত শত কোটি টাকা চোর-দুর্নীতিবাজদের পকেটে চালান দেয়া ছাড়া অন্য কিছুই হবে না।

এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরাসরি পানি দূষণ বন্ধ করা। দূষিত পানির দূষণ কমিয়ে আনার জন্য বাইরে থেকে পানি এনে কোনো নদীতে ফেলার থেকে সেই নদীর দূষণ সরাসরি বন্ধের ব্যবস্থাই হলো আসল কাজ। নদীর স্বাভাবিক প্রস্থ বজায় রেখে যদি সরাসরি নদী দূষণ বন্ধ করা যায় তাহলেই বুড়িগঙ্গা থেকে নিয়ে বাংলাদেশের শত শত নদী তার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা এর ঠিক উল্টো। ঢাকার পার্শ্ববর্তী চারটি নদীর কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে কী পরিমাণ বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য প্রতিদিন এই নদীগুলোতে পড়ে নদীর প্রাণ সংহার করছে। কোটি কোটি গ্যালন এই বর্জ্য ও মানববর্জ্য যেখানে নদীগুলোতে এসে পড়ছে সেখানে এই সমস্যার সমাধান প্রথমে না করে শত শত কোটি টাকা খরচ করে যমুনা নদী থেকে পরিষ্কার পানি এনে বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা যে প্রকৃতপক্ষে নদী রক্ষা নয়, এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো চুরি-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দ অর্থ লুটপাট, এটা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় কে বুকে হাত রেখে অস্বীকার করতে পারে?

ঢাকা শহরের মধ্যে অবস্থিত ট্যানারি বা চামড়ার কারখানাগুলো থেকে বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। বহুদিন থেকে এই ট্যানারিগুলো ঢাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথাবার্তা সরকারি মহলে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। শুধু তা-ই নয়, কতদিনে এই কারখানাগুলো স্থানান্তর সম্ভব হবে সে বিষয়েও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া সাভার, গাজীপুর ইত্যাদি এলাকায় অবস্থিত শত শত শিল্পকারখানা থেকে বিষাক্ত বর্জ্য নদী ও পার্শ্ববর্তী খাল-বিলে পড়ে নদীর পানি দূষিত করছে। একদিকে নদী দখল হতে থাকার কারণে নদীর প্রস্থ কমে এসে পানি প্রবাহ ধীরগতি হওয়া, এমনকি মাঝে মাঝে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা এবং অন্যদিকে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য পদার্থ নিয়মিতভাবে প্রতিদিন নদীগুলোতে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে যমুনা নদী থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গায় ফেলার প্রকল্প নদী পুনরুদ্ধার ক্ষেত্রে এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই দাঁড়াবে না।

নদীগুলো, বিশেষ করে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর যে অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে তাতে নদী দখল বন্ধ এবং নদীতে শিল্পবর্জ্যসহ অন্য বর্জ্য নিক্ষেপ এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বন্ধ করাই হচ্ছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজের জন্য সরকারের কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, নদী দখলকারী ভূমিদস্যু দমন এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলোকে বাধ্য করা বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু অনেক লেখালেখি, আলোচনা, সিটিং সত্ত্বেও এ দুই কাজ সরকারের দ্বারা হচ্ছে না। নদী সাময়িকভাবে দখলমুক্ত করে কাজ দেখালেও কয়েকদিন পর সেগুলো আবার দখল হচ্ছে। কারণ যারা এ কাজ করছে তারা সরকার বা সরকার বহির্ভূত শাসকশ্রেণীর প্রভাবশালী লোক। শিল্প মালিকদের দ্বারা বর্জ্য শোধন না করার কারণও এটাই। আসলে সরকার যেখানে সব রকম ক্রিমিনাল কাজের সব থেকে শক্তিশালী প্রশ্রয়দাতা এবং সরকারি লোকরাই যখন কলকারখানার মালিক ও তাদের আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব এবং দলীয় সমর্থক তখন নদী রক্ষার জন্য যে দুই ধরনের ক্রাইম বন্ধ করার প্রয়োজন অপরিহার্য বলা হয়েছে সে অপরিহার্য কাজ হওয়ার সম্ভাবনা অতিশয় ক্ষীণ। এই অবস্থায় ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’-এর জন্য ৯৪৫ কোটি টাকা ব্যয় দ্বারা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিণতি কী দাঁড়াবে সেটা বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনুমান করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১১/০৮/১১]

কম খেয়ে খাদ্য সমস্যা সমাধানে বাণিজ্যমন্ত্রীর তত্ত্ব বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী, যিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী পরিবারের লোক, বর্তমান মূল্য বৃদ্ধি ও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মহৌষধ বাতলাতে গিয়ে ৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক মতবিনিময় সভায় জনগণকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনারা কম খান, কম খেলে সমস্যা কমবে। ব্যবসায়ীরা ভেজাল মেশাতে নিরুৎসাহিত হবে। খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে সহজে প্রবেশ করে। আগেকার মানুষ কম খেত বলে বেশিদিন বাঁচত’ (আমার দেশ, সকালের খবর ৫-৮-২০১১)। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই মিলে পদক্ষেপ নিলে দ্রব্যমূল্য ও ভেজাল প্রতিরোধ সম্ভব হবে।’ কিছুদিন আগে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী জনগণকে উপদেশ দিয়েছেন বাজারে একদিন কম যাওয়ার! বাজারে একদিন কম গেলে চাহিদা কমবে এবং চাহিদা কমলে মূল্য বৃদ্ধিও হবে না। এই ছিল তার তত্ত্ব!! এর আগে সাইফুর রহমান ২০০১ সালে গঠিত বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময় বলেছিলেন, ‘চালের দাম বাড়ার জন্য ভাত খেতে না পারলে আপনারা বাঁধাকপি খান!’

এসব বক্তব্যের মধ্যে যে মিল দেখা যায় সেটা শাসক শ্রেণীর মৌলিক শ্রেণীগত ঐক্যের কারণেই ঘটে থাকে। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, আগেকার দিনে লোকে কম খেত বলে বাঁচত বেশি! বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় মনে হয় খুব অশিক্ষিত লোক নয়, কিছু শিক্ষাদীক্ষা অবশ্যই আছে। তাছাড়া কিছুটা জানাশোনা থাকলেও এটা তার জানার কথা যে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু আগের চেয়ে অনেক বেড়ছে। এটা খাদ্যের গুণে নয়। নানা ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কৃত হওয়ার কারণেই আয়ুর এই গড় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এই তথ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য গবেষণা বা পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয় না। এটা বাংলাদশের লোকেরা সাধারণভাবেই জানেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত একজন লোক কিভাবে বলতে পারেন যে, আগেরকার লোক কম খেত বলে তাদের আয়ু বেশি হতো! আসল ব্যাপার হল, গদিতে বসে থাকা এই ভদ্রলোকরা এখন ক্ষমতা মদমত্ত অবস্থায় একেবারে বেপরোয়া। তাছাড়া এ ধরনের কথা তাদের পক্ষেই বলা সম্ভব যাদের জনগণের প্রতি, তাদের সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির প্রতি বিন্দুমাত্র কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। এদের ধারণা, এরা যা বলবেন তাকেই মানুষ শিরোধার্য করবে!! এ দেশের মানুষ তাদের যেভাবে সহ্য করছে তাতে এরা গরু-ছাগল ছাড়া আর কী?

বাংলা ১২৭৬ বা খ্রিস্টীয় ১৭৬৯ সালে কোম্পানির আমলে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় এক প্রলয়ংকরী দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষে শুধু রংপুর অঞ্চলেই মৃত্যু হয়েছিল লক্ষাধিক লোকের। এসব মৃত্যু তো বেশি খাওয়ার জন্য হয়নি। হয়েছিল একেবারে খেতে না পাওয়ার জন্য।

দ্বিতীয় কথা হল, বাণিজ্যমন্ত্রী যেভাবে মানুষকে কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বিশেষত চালের মূল্য কমানোর কথা বলেছেন, তাতে মনে হয় দুর্ভিক্ষ কী কারণে হয় এটিও তার জানা নেই! দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটা ভূমিকা থাকলেও দুর্ভিক্ষ আসলে মানুষেরই সৃষ্টি। ১৭৬৯, ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দুর্বৃত্ত চরিত্রের ব্যবসায়ী ও সরকারি লোকদের দ্বারাই ঘটেছিল। এমনকি ঠিক এই মুহূর্তে সোমালিয়ায় যে দুর্ভিক্ষ চলছে, তাতে খরার একটা ভূমিকা থাকলেও এর একাধিক কারণের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট কারণটিই প্রধান।

বাংলাদেশে এখন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে খাদ্যাভাব হচ্ছে, সে মূল্যবৃদ্ধি কিভাবে হচ্ছে এটা ব্যবসায়ী পরিবারের লোক এবং খোদ ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষে না জানার কথা নয়। এ কারণে তিনিও এটা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে জনগণ, সরকার ও ব্যবসায়ীরা যদি একত্রে মূল্যবৃদ্ধি বন্ধের জন্য চেষ্টা করেন, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব! এখানে সরকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জনগণকেও জড়িত করে তিনি মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বকে লঘুভাবে দেখানোর যে চেষ্টা করেছেন, এটা অসাধুতার দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কী?

একথা ঠিক যে, রমজানের সময় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত খাওয়ার যে চেষ্টা হয় তার ফলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি হয় ও সেই সুযোগে ব্যবসায়ীরা মূল্য বৃদ্ধি করে। এ বিষয়ে রমজান মাসে তারা যদি সংযম করেন, তাহলে ব্যবসায়ীরা অবাধ মূল্যবৃদ্ধির মতো দুর্বৃত্তগিরি করতে পারে না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, জনগণ কম খেলেই বাজার দ্রুত নিয়ন্ত্রিত হবে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারবে না। কারণ রমজানের সময় মূল্যবৃদ্ধির জন্যও না খেতে পাওয়া লোকরা দায়ী নয়।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে খাদ্যদ্রব্যের যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষের, জনগণের, বেশি খাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তারা কোনমতে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যতটুকু খাওয়া দরকার তার চেয়ে কমই খাচ্ছেন। যে শ্রমিকরা মাসে দু-তিন-চার হাজার মজুরি পাচ্ছেন, বা যাদের আয় তার চেয়েও কম তারা দিনে একবার সামান্য খেয়েই থাকছেন। পেটে কোনমতে কিছু ভাত ফেলতে পারলেও তরকারি জোগাড় করা তাদের পক্ষে মুশকিল। অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো ব্যক্তিরা নিজেরা বেশি খান বলে তাদের মনে হচ্ছে যে, কম খেলে বাজারে চাহিদা কমবে এবং চাহিদা-সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্যের দাম কমবে! কিন্তু তারা প্রতিদিন যে পরিমাণ খান ও যত ভালো জিনিস খান তার ধারে-কাছে যাওয়াও বাংলাদেশের শতকরা নব্বই ভাগ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, আগেই বলা হয়েছে, তাদের দু’বেলা ভাত খাওয়ার সংস্থান পর্যন্ত নেই। তরিতরকারিও যে অগ্নিমূল্য তাতে ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু জোগান দেয়াও তাদের পক্ষে এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার।

এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী কর্তৃক জনগণকে কম খেয়ে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা ও ভেজাল বন্ধ করার পরামর্শ জনগণের সঙ্গে উপহাস করা, তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেরা সরকার-ব্যবসায়ী আঁতাতের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির কলকাঠি নেড়ে চলার চক্রান্ত কার্যকর করে চলা ছাড়া আর কী?
বাংলাদেশের জনগণের আজ সমস্যার অভাব নেই। গরিব মানুষের জীবন ছাড়া বাংলাদেশে এখন সব কিছুরই মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। একদিকে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যদিকে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আয় বৃদ্ধি না হওয়ায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় দিন দিন কমছে। এই আয় কমতে থাকার কারণে তাদের বেশি খাওয়ার কোন প্রশ্নই নেই। উপরন্তু এর ফলে প্রতিদিনই তারা নিজেদের খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অবস্থায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হিসেবে বাণিজ্যমন্ত্রী জনগণকে কম খেয়ে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও ভেজাল বন্ধের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার যে কথা বলেছেন সেটা এই দুই ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে তিনি মূল্য বৃদ্ধি ও ভেজালের জন্য জনগণকে দায়ী করে যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে একটি অপরাধতুল্য ব্যাপার। এই অপরাধের জন্য বর্তমান অবস্থায় তার শাস্তির কোন সম্ভাবনা না থাকলেও উপযুক্ত শাস্তি তার প্রাপ্য।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ০৭/০৮/১১]

বাংলাদেশে অপরাধের জগৎ যেভাবে চলছে বদরুদ্দীন উমর

পুলিশের অপরাধমূলক বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের এই মুহূর্তের এক দৃষ্টান্ত হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ডাকাত বলে গ্রেফতার করে, তাকে নিজেদের হেফাজতে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা। আবদুল কাদেরকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ জেনেও পুলিশ যে এখনও তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে না নিয়ে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে এটা স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব নয়। এটা সম্ভব হচ্ছে বর্তমানে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় দেশজুড়ে এক অস্বাভাবিক অপরাধের পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে। একের পর এক সরকার যদি নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতায় নিজেরা জড়িত না থাকত এবং অপরাধ দমনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করত, তাহলে এই পরিস্থিতি দেশে এভাবে সৃষ্টি হতো না।

বাংলাদেশে অপরাধের ব্যাপকতা, বৈচিত্র্য ও মাত্রা এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যার সঙ্গে ভয়াবহ নৈরাজ্যিক পরস্থিতির পার্থক্য নেই। এই অপরাধের জগতেই এখন বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের বসবাস। এদিক দিয়ে গ্রাম ও শহরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর সব থেকে বিপজ্জনক দিক হলো, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই। উপরন্তু এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে স্থানীয় জনগণ ঘটতে থাকা নির্যাতনের দৃশ্য নির্বিকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। সালিশের নামে রংপুরের বদরগঞ্জে গৃহবধূ নির্যাতনের এ ধরনের এক দৃশ্য 'সকালের খবর'-এর শেষ পৃষ্ঠায় আজ ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূটিকে চিৎ করে ফেলে জন দুই লোক লাঠিপেটা করছে এবং স্থানীয় লোকজন চেয়ারে বসে ও চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য উপভোগ করছে! বিগত ৭ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে 'সালিশে প্রকাশ্যে দুই গৃহবধূকে লাঠিপেটা' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে রুল জারি করে এই ঘটনার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এ ধরনের ঘটনা গ্রামে নতুন বা ব্যতিক্রম নয়। নিয়মিতভাবেই এটা গ্রামাঞ্চলে বেশ কিছুদিন থেকে ঘটে চলেছে। এর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ, হাইকোর্টের রুলিং ইত্যাদি হলেও এ ধরনের নারী নির্যাতন বন্ধের কোনো লক্ষণ এখনও পর্যন্ত নেই। বদরগঞ্জে সদ্য সংঘটিত ঘটনাটিই এর প্রমাণ।

গ্রামে যেমন আছে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা, তেমনি আছে অন্য ধরনের ঘটনা যা দেখা গেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। ঢাকার গাবতলী-আমীনবাজার এলাকায় রাতে ডাকাত সন্দেহে ছয়জন ছাত্রকে গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাদের আটক করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে, তাদের পরিচয় জানার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। ডাকাত ধরার নাম করে তারা নিজেদের খুনের স্পৃহা চরিতার্থ করতে গিয়েই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। একদিকে গৃহবধূ নির্যাতন ও সেই নির্যাতনের দৃশ্য দাঁড়িয়ে, বসে দেখা ও উপভোগ করা এবং অন্যদিকে এভাবে ছয়জন ছাত্রের পরিচয় জানার কোনো চেষ্টা না করে দল বেঁধে গ্রামবাসী কর্তৃক তাদের পিটিয়ে হত্যা করার মধ্যে অপরাধ প্রবণতার চারিত্রিক মিল অবশ্যই আছে।
আজকের দৈনিক সমকালেই মেঘনার জেলেদের ওপর একটি রিপোর্ট প্রথম পৃষ্ঠাতেই বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নদীতে এখন প্রচুর মাছ ধরা পড়লেও জলদস্যু নিজাম ও তার গ্রুপের সদস্যদের চাঁদা পরিশোধ করতে না পারায় নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না শত শত জেলে। নিজাম ডাকাত বড় নৌকাপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ও ছোট নৌকাপ্রতি ৩০-৪০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এই চাঁদা পরিশোধ করে জেলেদের 'নিজাম ডাকাত টোকেন' সংগ্রহ না করলে নদীতে গিয়ে তাদের মাছ ধরার উপায় নেই। নদীতে টহল পুলিশের কোনো কথা এ রিপোর্টে না থাকলেও জলদস্যুরা যে পুলিশের কাছ থেকে টাকা খেয়েই অবাধে তাদের দস্যুবৃত্তি করে থাকে এতে সন্দেহ নেই!

প্রতিদিনই নানা ধরনের অপরাধ দেশজুড়ে এমনভাবে ঘটছে যাতে এটা মনে করা স্বাভাবিক যে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। এ অবস্থা রীতিমতো আতঙ্কজনক। কিন্তু এর থেকেও আতঙ্কজনক ব্যাপার এই যে, এই পরিস্থিতি দ্রুতগতিতে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হচ্ছে। বাংলাদেশে এটা কেন ঘটছে এর কারণ অনুসন্ধান করলে সহজেই বোঝা যাবে, সরকার ও বিভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের অপরাধমূলক তৎপরতাই মূলত এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং এর অবনতি ঘটিয়ে চলেছে। বেপরোয়া ঘুষ, চুরি, দুর্নীতি থেকে নিয়ে খুন-জখম পর্যন্ত সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। মন্ত্রী, এমপি প্রমুখের দুর্নীতির ওপর রিপোর্ট নিয়মিতই প্রকাশিত হয়। আমলারাও এই দুর্নীতির বড় অংশীদার। দু'একদিন আগে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, হুইপ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য প্রমুখের আপ্যায়ন বাবদ বছরে কোটি কোটি টাকা খরচের একটা হিসাব বের হয়েছে। এতে দেখা যায়, তারা কে কত খরচ করবেন তার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। ফুর্তির বশবর্তী হয়ে তারা যতই লাখ লাখ টাকা খরচ করুন তার কোনো বিরোধিতা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নেই। অন্য ধরনের দুর্নীতির কথা বাদ দিয়েও উচ্চতম পর্যায়ের এই আপ্যায়ন খরচও যে এক অবাধ দুর্নীতির ব্যাপার এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এসবের সঙ্গে দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধের যোগ সম্পর্ক আছে। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির সঙ্গে যার যোগ সব থেকে বেশি তা হলো, পুলিশি নির্যাতন এবং পুলিশের নিজেরই অপরাধমূলক তৎপরতা। এই পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কিত আছে র‌্যাবসহ বিভিন্ন ধরনের বাহিনী। পুলিশ যেখানে নাগরিকদের রক্ষকের ভূমিকা বাদ দিয়ে নিজেই তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে সমাজে অপরাধের বিস্তার যে অবাধে ঘটতে থাকবে এটা স্বাভাবিক।

পুলিশের অপরাধমূলক তৎপরতার সব থেকে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রায়ই প্রকৃত অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিয়ে নিরপরাধ লোককে অপরাধী সাজানোর জন্য নানা ক্রিমিনাল পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ। এটা কিছুদিন আগে লিমনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আসল অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে তার মতো একজন নিরীহ ও নিরপরাধ ছাত্রকে গুলি করে তার পা নষ্ট করে দেওয়ার মতো অপরাধ যেখানে র‌্যাব নিজেই করে, সেখানে তার দ্বারা যে সাধারণ চোর, ডাকাত ও গুণ্ডারা উৎসাহিত হয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে র‌্যাব-পুলিশের সহায়তায় আইনকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরাও খুন-জখম করবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। লিমনের ব্যাপার নিয়ে দেশব্যাপী এত বিক্ষোভ ও লেখালেখি সত্ত্বেও র‌্যাব যে এখনও পর্যন্ত তাদের অপরাধমূলক অবস্থান থেকে একটুকুও নড়েনি, এটা অপরাধের জগৎ ভালোভাবেই লক্ষ্য করে। এর মধ্যেই তারা নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। এ জন্য বাংলাদেশে এখন অপরাধের যত ঘটনা ঘটছে সেগুলো যে শুধু র‌্যাব-পুলিশের নিজেদের অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে উৎসাহ লাভ করেই ঘটছে তাই নয়। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটছে তাদের সঙ্গে সাধারণ অপরাধীদের যোগসাজশের মাধ্যমে অথবা অপরাধী পাকড়াও করার ক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য। এ সম্পর্কিত রিপোর্ট এখন সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিত ব্যাপার।

পুলিশ যে তাদের অপরাধমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভকে মোটেই পরোয়া করে না, এর প্রধান কারণ পুলিশের অপরাধের জন্য তাদের দ্রুত শাস্তি তো দূরের কথা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো শাস্তির ব্যবস্থা সরকারিভাবে করা হয় না। পুলিশ যেভাবে অপরাধীদের নিজেদের নাকের ডগায় অপরাধ চালিয়ে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই সহায়তা করে, তেমনি সরকার আবার পুলিশের অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা তো দূরের কথা, তাদের শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টাই করে থাকে। সরকার ও সরকারি লোকজন নিজেরা যেসব অপরাধ করে তার জন্য পুলিশের সাহায্য তাদের প্রয়োজন হয়। কাজেই পুলিশকে অপরাধের শাস্তি থেকে রক্ষা করা হয়ে দাঁড়ায় সরকারের দায়িত্ব!

পুলিশের অপরাধমূলক বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের এই মুহূর্তের এক দৃষ্টান্ত হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ডাকাত বলে গ্রেফতার করে, তাকে নিজেদের হেফাজতে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা। আবদুল কাদেরকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ জেনেও পুলিশ যে এখনও তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে না নিয়ে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে এটা স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব নয়। এটা সম্ভব হচ্ছে বর্তমানে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় দেশজুড়ে এক অস্বাভাবিক অপরাধের পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে। একের পর এক সরকার যদি নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতায় নিজেরা জড়িত না থাকত এবং অপরাধ দমনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করত, তাহলে এই পরিস্থিতি দেশে এভাবে সৃষ্টি হতো না।

অপরাধের জগৎ দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এবং চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা দাঁড়াত না। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, গৃহবধূ নির্যাতন, ক্রমবর্ধমান হারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১০-২০ জনের মৃত্যু, নদীতে জলদস্যুদের অবাধ অপরাধ, লিমন ও কাদেরের মতো ছাত্রের ওপর র‌্যাব-পুলিশের নির্যাতন একই অপরাধের সূত্রে গ্রথিত আছে। এবং এসব অপরাধের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র আছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার ও রাষ্ট্রের অপরাধ দমন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তো বটেই, উপরন্তু তাদের নিজেদেরই নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার।
[সূত্রঃ সমকাল, ০২/০৮/১১]

তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে কি পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরত আসবে? বদরুদ্দীন উমর

শাসক শ্রেণীর প্রধান দলগুলোর অবস্থা দেখে মনে হয়, নির্বাচন সমস্যা ছাড়া এদের চিন্তা-ভাবনায় আর কিছুই নেই যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জনগণের কাছে নির্বাচন কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয়, বিশেষ করে পরবর্তী নির্বাচন যখন এখনও অনেক দূরে, আড়াই বছর পর। এদের রাজনীতিতে নির্বাচন যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এটা ঠিক। এ নিয়ে এদের দোষারোপ করারও কিছু নেই। কিন্তু নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং নির্বাচনকে রাজনৈতিক কর্মসূচিসর্বস্ব মনে করা ভিন্ন ব্যাপার। এ দ্বিতীয় ব্যাপারটি এখানে হচ্ছে। এটা যে সমগ্র শাসক শ্রেণীর শ্রেণীগত অবস্থানের শোচনীয় দেউলিয়াপনারই প্রমাণ এতে সন্দেহ নেই।

নির্বাচনই যেহেতু এই রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এ কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের রাজনৈতিক কলাকৌশল ও দুর্নীতির অন্ত নেই। সংবিধান সংশোধন থেকে নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠনের তৎপরতা পর্যন্ত সবকিছুই এখন একই সূত্রে গাঁথা। নির্বাচনই এসবের কেন্দ্রীয় বিষয়।

রাজনৈতিকভাবে নির্বাচন ও নির্বাচিত জাতীয় সংসদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে, এমন বলার উপায় নেই। নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন যে কোন সময়েই কারচুপিহীন থাকেনি, এ অভিজ্ঞতা সব সময়েই হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আশির দশকে এরশাদের সামরিক সরকার উচ্ছেদ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তৎকালীন বাংলাদেশের বিশেষ অবস্থায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব হলেও এভাবে নির্বাচিত প্রথম সরকারের মেয়াদ শেষে দেখা যায়, এর প্রয়োজন শেষ হয়নি। ক্ষমতাসীন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনবিরোধীদের দ্বারা অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ সংশোধনী মোতাবেক ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে পর পর তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে সরকার গঠিত হয়। দেখা যায়, এই তিন নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়ে বিরোধী দল ক্ষমতায় আসে। এর থেকে প্রমাণিত হয়, যে দলকে ভোটাররা নির্বাচিত করেন, তারা ক্ষমতায় বসে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে তার খেলাপ কাজ করে এমন অজনপ্রিয় হয়, যাতে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা তাদের আর সরকারে বসান না।

এভাবে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় এদিকে খেয়াল রেখে নির্বাচন কমিশনকে সরকারদলীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন করার প্রবণতা এ দলগুলোর পক্ষে স্বাভাবিক। এ প্রবণতার বশবর্তী হয়েই আওয়ামী লীগ সরকার এমন এক সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে বিদ্যমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। নির্বাচিত বিদ্যমান সরকারের অধীনে নির্বাচন গণতন্ত্রসম্মত এবং দুনিয়ার সব দেশে এটা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও আগে তাই হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন বিদ্যমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা সম্ভবত না থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হল, একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। আসলে ১৯৯০ সালের পর থেকে নির্বাচন কমিশনকে বিদ্যমান সরকার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকায় অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী সরকারি হস্তক্ষেপে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অকেজো হওয়ার ষোলআনা সম্ভাবনার জন্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্য সংসদীয় দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারই চেয়েছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিএনপিকে বাধ্য করেছিল। নিজেদের সরকারি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন করে তারা সরকার গঠন করলেও আওয়ামী লীগ সে নির্বাচন বয়কট করায় নির্বাচন কারও জন্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারকে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তার অধীনে নির্বাচন করতে হয়। ১৯৯৬ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং তার থেকে বোঝার কোন অসুবিধা ছিল না যে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ক্ষমতায় ফেরত আসা সম্ভব ছিল না। পরাজয় নিশ্চিত জেনে কারচুপির মাধ্যমেই ১৯৯৬ সালের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে নিজেদের সরকারের অধীনেই নির্বাচন করেছিল।

দেখা যায়, ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভের কোন ক্ষমতাই এ দলগুলোর নেই। হতে পারে, ক্ষমতার নেশায় অন্ধ এবং উন্মাদ হয়ে এরা ইতিহাসের দিকে তাকানো অথবা নিজেদের অভিজ্ঞতার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে অক্ষম থাকে। এটা শুধু অন্ধত্ব এবং উন্মাদগ্রস্ততারই পরিচায়ক নয়, এর আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এদের গণতান্ত্রিক চরিত্রহীনতা ও দেউলিয়াপনা। যাই হোক, এ সবেরই বশবর্তী হয়ে এরা যেসব কাজ করে তার মধ্যে যুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বুদ্ধি-বিবেচনার দেখা পাওয়া যায় না।

জাতীয় সংসদের পরবর্র্তী নির্বাচন এখনও আড়াই বছর দূরে থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করেছে এবং তাদের সর্বস্তরের নেতৃত্ব থেকে এখন প্রায় প্রতিদিনই বলা হচ্ছে যে, আগামী নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই হবে। ‘নির্বাচিত সরকারের অধীনে’ নির্বাচন হবে এ কথা বলে, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে এরা যতই গণতন্ত্রী সাজার চেষ্টা করুন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল যে তাদের গণতন্ত্র পূজার কারণেই হয়েছে এটা দেশের একজন লোকও বিশ্বাস করে না এবং যারা উচ্চকণ্ঠে এর পক্ষে প্রচার চালান তারা নিজেরাও বিশ্বাস করেন না। তারা বিলক্ষণ জানেন, কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা গণতন্ত্রী সেজে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলে চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছেন। আসল কথা হল, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর চরম অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণেই অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন থেকে বেশি গণতান্ত্রিক! এটাই বাংলাদেশের বর্তমান বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর রাজনীতির এক গুরুতর স্ববিরোধিতা। এই স্ববিরোধিতার প্রতিফলনই আমরা দেখছি প্রধান দুই দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্কের মধ্যে।

আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে যেমন গণতন্ত্র পূজার কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি, তেমনি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি করেও তাদের গণতন্ত্র পূজার কোন পরিচয় প্রদান করছে না। কারণ এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীত অবস্থানের লক্ষ্য অভিন্ন। এই লক্ষ্য হল, আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করা। এর জন্য প্রয়োজন হলে গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক যে কোন উপায়ই হল তাদের জন্য হালাল!

বাংলাদেশে সব কাজ ফেলে দিয়ে, সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যার প্রতি প্রকৃতপক্ষে উদাসীন থেকে, শাসক শ্রেণীর দলগুলো যেভাবে নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি করছে এর মাধ্যমে তাদের উভয় পক্ষেরই অগণতান্ত্রিক চরিত্রের স্বাক্ষর তারা রাখছে।

এ বিষয় নিয়ে অধিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। তবে এটা এখানে স্পষ্টভাবেই বলা দরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে বিদ্যমান ক্ষমতাসীন সরকার যদি পরবর্তী নির্বাচন করে তাহলে এদের অবস্থা হবে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচনের মতো। কারণ সেই নির্বাচন কারও দ্বারা গ্রহণযোগ্য হবে না। এই অবস্থায় নির্বাচনের পর যদি সরকার টিকে থাকে, তাহলে তাকে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের মতোই সংবিধান সংশোধন করে তাদের আর একটি নির্বাচন করতে হবে। ১৯৯৬ সালে সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আওয়ামী লীগ সরকারকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত আনতে হবে। রাজনীতির সঙ্গে যাদেরই সামান্য সম্পর্ক আছে, যারা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু খবর রাখেন তাদের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকারের’ মাধ্যমে নির্বাচনের এই পরিণতি বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এসবের কোন তোয়াক্কা না করে এ দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ যে পথ ধরেছে তার থেকে এদের নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা এবং বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতির অকার্যকারিতাই বিশেষভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ৩১/০৭/১১]

বাংলাদেশের সমাজভূমি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বদরুদ্দীন উমর

বর্তমানে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনীতি ক্ষেত্রে যে অচলাবস্থা দেখা যাচ্ছে সে অচলাবস্থা দূর করার জন্য বিদ্যমান সমাজভূমির দিকে তাকাতে হবে। এই সমাজভূমি পরিবর্তনের জন্য লড়তে হবে। এ লড়াই কোনো সাংবিধানিক লড়াই নয়, একের পর এক 'নিরপেক্ষ' নির্বাচনের লড়াই নয়। এই লড়াই যতদিন পর্যন্ত না বাংলাদেশে রাজনীতির সব থেকে গ্রাহ্য ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত কোনো প্রকৃত সামাজিক পরিবর্তন তো সম্ভব নয়ই, এমনকি জনগণের পক্ষে এ ক্ষেত্রে আশার আলো দেখারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশে চুরি, দুর্নীতি, ঘুষখোরি, খুন-খারাবি থেকে নিয়ে শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক খেয়োখেয়ি পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে স্থূলতা (crudity) যেভাবে দেখা যায় এটা অন্য দেশে দেখা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেলেও এই স্থূলতা এত সর্বগ্রামী কোথাও নয়। স্থূলতা এমন এক জিনিস যা মানুষের আচরণ থেকে শুধু সততা নয়, লজ্জা-শরম, অন্যের প্রতি সামান্যতম বিবেচনা পর্যন্ত সবকিছুই বিসর্জন দেয়। এটা বলাবাহুল্য যে, স্থূল ব্যক্তি সংস্কৃতির কোনো উচ্চমার্গের বাসিন্দা নয়। তার বসবাস অতি নিম্ন চরিত্রের সংস্কৃতির সঙ্গে।

এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশ আজ যেসব সমস্যার দ্বারা জর্জরিত, সেগুলো তার অস্তিত্বের গভীর দেশেই তৈরি হয়েছে। এ কারণে সর্বক্ষেত্রেই আচরণের স্থূলতার যে কথা বলা হয়েছে সেগুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

স্থূলবুদ্ধির একটা পরিচয় এই যে, সে কখন কী বলে ও করে তা খেয়াল করতে পারে না বা পরোয়া করে না। কাজেই তার আচরণের মধ্যেও কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। সমাজ বা রাজনীতির উচ্চ আসনে এ ধরনের লোক যদি অধিষ্ঠিত থাকে, তাহলে নিজের পদমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ কী হওয়া উচিত এ বিষয়েও তার ধারণা থাকে না। এখানে এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, বাংলাদেশে আজ যেদিকেই তাকানো যায়, সেদিকেই এ স্থূলতা দৃষ্টিগোচর হয়। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর সমগ্র অংশই স্থূলতাপ্রাপ্ত হয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশকে এই চরিত্র দোষে দূষিত করেছে।

১৯৭১ সালের ঠিক পর থেকেই অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই সমাজের অপরাধিকীকরণ বেশ হঠাৎ করেই দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর শুরু শাসকশ্রেণীর উচ্চস্তরে সরাসরি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের দ্বারা, সরকারের সঙ্গে নানা সূত্রে সম্পর্কিত লোকদের দ্বারা। এ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল না। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল হঠাৎ করে স্বাধীনতার পরমুহূর্তেই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকজনের সামনে আদিগন্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার ফলে। এই সম্ভাবনা তাদের মধ্যে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাগিদ সৃষ্টি করেছিল লুটপাটের। তারা নিজেরা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না, যা কিছু তাদের আয়ত্তের মধ্যে এসেছিল সেটা তাদের দ্বারা উৎপাদিত হয়নি। অন্যের উৎপাদিত সম্পদ হাতের কাছে পেয়ে তারা লুটপাট করেছিল। লুটপাট হচ্ছে ধনসম্পত্তি অর্জনের নিকৃষ্টতম পথ। ভালো কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের চরিত্র যেমন উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়, পরিশীলিত হয়, তেমনি খারাপ কাজ মানুষের চরিত্রের অবনতি ও অধঃপতন ঘটায়। স্বাধীনতার জন্য যথাযথভাবে রাজনৈতিকভাবে তৈরি না হওয়ায় হঠাৎ স্বাধীনতা বাংলাদেশের লোকদের, বিশেষত শাসকশ্রেণীর লোকদের সামনে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছিল, সেই সম্ভাবনা এ দেশের জন্য কল্যাণকর না হয়ে অকল্যাণের পথই প্রশস্ত করেছিল। এটা ঠিক যে, ধনসম্পদের দিক দিয়ে, সার্বিকভাবে উৎপাদনের দিক দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু উন্নতির প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, মনুষ্যত্বের মাপকাঠিতে এর জন্য বাংলাদেশের জনগণকে যে মূল্য দিতে হয়েছে তা অসামান্য, তার হিসাব দাঁড় করানো এক কঠিন সাধ্য ব্যাপার।

প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখলে বোঝা যায়, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় যে মধ্য শ্রেণী গঠিত হয়েছিল, শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে, ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে সংগ্রামের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, এক কথায় সামগ্রিকভাবে যে সমাজ তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে চুরমার হয়েছে। পূর্ববর্তী সমাজের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে সমাজ এখন খাড়া হয়েছে এর সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সংস্কৃতির নিম্নমানতা, নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, মানুষের প্রতি মানুষের বিবেচনার চরম অভাব, অনাড়ম্বর ও মিথ্যাচরণের প্রাধান্য এবং এসব মিলিয়ে সমাজের বিরাট অংশের অপরাধিকীকরণ। শুধু তাই নয়, একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ওপরে যেসব নেতিবাচক দিকের উল্লেখ করা হলো, তার প্রত্যেকটির নিয়মিত বৃদ্ধি। বাংলাদেশে যেভাবে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, সেভাবেই বৃদ্ধি হচ্ছে সমাজের অপরাধিকীকরণের মাত্রা! এর শেষ কোথায়, এ প্রশ্ন এখন সকলের সামনে।

সমাজের ওপর তলায় যা ঘটে, শাসকশ্রেণী ও তার সরকার যে শাসন পরিচালনা করে ও যেভাবে সেটা করে, তার প্রভাবেই সামগ্রিকভাবে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়। বৈপ্লবিক পরিস্থিতি ছাড়া অন্য সময়ে এটাই হলো সাধারণ নিয়ম। বাংলাদেশে কোনো বৈপ্লবিক পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে এই সাধারণ নিয়ম অনুযায়ীই সমাজ পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থা যে কত ভয়াবহ এটা শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলো ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর আচরণের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এদিক দিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ দাঁড়িয়েছে এ কারণে যে, বাংলাদেশ এখন ব্যবসায়ীদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। আগে যেখানে ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতেন, রাজনৈতিক দলগুলো অনেকাংশে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করত, সেখানে আজ ব্যবসায়ীরা নিজেরাই সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দখল করে নিজেদের স্বার্থ সামাল দিচ্ছেন! অর্থাৎ বাংলাদেশে এখন ব্যবসায়ীরাই রাজনৈতিক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছে! বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বিপুল অধিকাংশ সদস্য। আশি শতাংশের ওপরই এখন ব্যবসায়ী। অন্যদেরও বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত!

কোনো দেশে ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তার পরিণতি সমাজের জন্য কী দাঁড়ায় কার্ল মার্কস তার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'পুঁজি'র তৃতীয় খণ্ডে। তিনি সেখানে বলেছেন, Merchants capital, when its holds a position of dominance, stands every where for a system of robbery, so that its development among the trading nations of old and modern times is always directly connected with plundering, piracy, kidnapping slaves, and colonial conquest, Capital vol iii page 331, 1966). ব্যবসায়ী পুঁজি সমাজে প্রাধান্যে হলে চারদিকে লুটতরাজ, দস্যুতা, অপহরণ ইতাদি ঘটতে থাকার যে কথা ওপরের উদ্ধৃতিতে মার্কস বলেছেন তার আধুনিকতম দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। ১৯৭২ সাল থেকে অনুৎপাদক শ্রেণীর লোকজন রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে ব্যাপক লুণ্ঠনের মাধ্যমে ধনসম্পদ অর্জন করে যেভাবে ব্যবসায়ী শ্রেণীতে পরিণত হয়ে সমগ্র সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করেছে ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এর মধ্যে মার্কসের উপরের বক্তব্যের সঠিকতা ও সত্যতাই নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সাল পূর্ববর্তী এ দেশের সমাজ ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী পুঁজি কর্তৃক রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ভূমিকা সম্পর্কে এখানে কোনো চিন্তাভাবনা আজ পর্যন্ত শাসকশ্রেণীর গবেষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেখা যায়নি। এই শ্রেণীবৃত্তের বাইরে এ বিষয়ে যে চিন্তাভাবনা হয়েছে সেটাও হিসাবের মধ্যে নেওয়ার প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। কাজেই স্বাধীন বাংলাদেশে পূর্ববর্তী সমাজ ভেঙে পড়ে যে নতুন সমাজ গঠিত হয়েছে, তার চরিত্রের ভয়াবহতা এখন সকলের চোখের সামনে থাকলেও এর কারণ সম্পর্কে খুব অল্প লোকেরই হয়তো কিছু ধারণা আছে।

সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের উপায় কী, এ নিয়ে বিশেষ কারও কোনো ধারণা আছে মনে করার কারণ নেই। তাছাড়া যারা বিদ্যমান শাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, বহু বিচিত্রমুখী লুটতরাজের যারা ফলভোগী, তারা এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের বিরোধী। অন্যদিকে ৪০ বছর ধরে এই শ্রেণীশাসন পুরনো সমাজ ভেঙেচুরে দেশের মানুষের মধ্যে চিন্তার ও আচরণের যেসব অভ্যাস তৈরি করেছে, যার কিছু উল্লেখ এ আলোচনার শুরুতে করা হয়েছে, সেটাও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ। সংস্কৃতি ও রাজনীতির শীর্ষ দেশ থেকে নিয়ে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত এই বাধার দেয়াল কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে এ নিয়ে গুরুতর কোনো চিন্তাভাবনা না হলেও এটাই মূল কারণ যে জন্য বাংলাদেশে আজ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ কর্মীর এত দুর্ভিক্ষ। যে সমাজভূমি থেকে এ ধরনের কর্মীরা বিপ্লবী পরিবর্তনের তাগিদে আবির্ভূত হন আজকের বাংলাদেশের সমাজভূমি সে রকম নয়। কাজেই বর্তমানে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনীতি ক্ষেত্রে যে অচলাবস্থা দেখা যাচ্ছে সে অচলাবস্থা দূর করার জন্য বিদ্যমান সমাজভূমির দিকে তাকাতে হবে। এই সমাজভূমি পরিবর্তনের জন্য লড়তে হবে। এ লড়াই কোনো সাংবিধানিক লড়াই নয়, একের পর এক 'নিরপেক্ষ' নির্বাচনের লড়াই নয়। এই লড়াই যতদিন পর্যন্ত না বাংলাদেশে রাজনীতির সব থেকে গ্রাহ্য ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত কোনো প্রকৃত সামাজিক পরিবর্তন তো সম্ভব নয়ই, এমনকি জনগণের পক্ষে এ ক্ষেত্রে আশার আলো দেখারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
[সূত্রঃ সমকাল, ১৯/০৭/১১]

শাসকশ্রেণীর রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির বিপজ্জনক পরিণাম বদরুদ্দীন উমর

পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের জনগণ নিজেদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক ধরনের সংস্কার ও পশ্চাৎপদ চিন্তা পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন। রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাবের নগণ্যতা ও প্রান্তিকীকরণ ছিল এই আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফল। সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে যে ভূমিকা পালন করেছিল তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করে রেখে বাংলাদেশে কোন কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ উদ্ধার করতে নিযুক্ত থাকাই অন্যতম কারণ, যার জন্য যে পশ্চাৎপদতা পাকিস্তানি আমলে জনগণ সংগ্রামের মাধ্যমে পেছনে ফেলেছিলেন বাংলাদেশে সেটাই আবার ফিরে এসেছে। পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা অস্বীকার করে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও ক্ষমতাসীন মতলববাজ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক কৃতিত্ব জাহির করে অন্য সব ধরনের সংগ্রামকে যেভাবে আড়াল করেছিল এবং এখনও পর্যন্ত আড়াল করে রাখে, সেটাই বর্তমানে রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। পাকিস্তানি জমানায় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী যে সেক্যুলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল তার কোন খবরই বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম রাখে না। কোন আলোচনা, কোন পাঠ্যবইয়ে সেই সংগ্রামের নাম-গন্ধ কোথাও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। কাজেই বর্তমান প্রজন্ম যে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হওয়ার কারণেই সামগ্রিকভাবে মানুষের চিন্তাভাবনা পশ্চাৎপদতা উত্তীর্ণ হয়ে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সেক্যুলার হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া যত স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল, অন্য ক্ষেত্রে সেটা তত স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও সেই অভিন্ন প্রক্রিয়া ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জারি ছিল। বাংলাদেশ আমলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় শাসকশ্রেণী ও তাদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিস্ময়করভাবে দ্রুত চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে পরিণত হওয়ায় পশ্চাৎপদ চিন্তা জনগণের মধ্যে আবার ফিরতে শুরু করে। এই পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনার চেহারাই আমরা এখনকার এক ধরনের বিকৃত ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে দেখছি। রাজশক্তির অস্ত্রের জোরের থেকে সুফি ধর্ম প্রচারকদের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার আবেদনেই বাংলাদেশের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা দখলের আগে থেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন। ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালে মুসলমান রাজশক্তি পর্যন্ত অস্ত্রের জোর প্রয়োগ করেনি, সুফি ধর্ম প্রচারকরাও হজরত মুহম্মদ (সাঃ) বা ইসলামের মর্যাদা প্রচার ও রক্ষণের জন্য রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে বের হওয়ার চিন্তাও করেননি। তখনকার সঙ্গে বর্তমানের এটাই বড় পার্থক্য। শুধু শত শত বছর আগের কথাই নয়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, ইসলামের মর্যাদা রক্ষার জন্য পাকিস্তানি আমলেও ধার্মিক মুসলমানরা রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে নামেননি। এখনকার ইসলামী ‘জেহাদিদের’ থেকে তারা ব্যক্তিগতভাবে অনেক ধার্মিক ছিলেন। শুধু নামাজ রোজার ব্যাপারেই নয়, ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও তাদের নৈতিক মান অনেক উচ্চ ছিল। ইসলামের মর্যাদার জন্য কর্তব্য কী, এ বিষয়ে তাদের চিন্তাভাবনাও ছিল এখনকার থেকে অনেক ভিন্ন এবং বলতে অসুবিধে নেই, অনেক উচ্চতর।

এই মুহূর্তে সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো না রাখার জন্য ধর্মীয় দলগুলো লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে যেভাবে সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তার থেকে মনে হয় আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস লাঠির জোরে স্থাপন করার ব্যাপার!! কোন ধর্মের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস যে এভাবে স্থাপন করানো যায় না, এটা বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞান-বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। কাজেই বোঝার অসুবিধে নেই যে, বর্তমানে ইসলামের ‘ইজ্জত রক্ষাকারী’ দল হিসেবে কিছু ধর্মীয় দল এখন জ্ঞান-বুদ্ধির ঘরে তালা ঝুলিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে চারদিকে এক বিশৃংখল পরিস্থিতি তৈরি করছে। মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে তারা নিজেদের এই লাঠি মিছিলে বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে শুক্রবার মসজিদ থেকে মুসল্লিদের বের করে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে ইসলামের শক্তি প্রদর্শনের নাম করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টায় আছে, যার সঙ্গে ইসলামের আল্লাহর বা কোন ধরনের ধর্মীয় ব্যাপারের কোন সম্পর্ক নেই।

সংবিধানে ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো না রাখাকে যারা ইসলামের প্রতি অবমাননা বলে মনে করে এবং এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের ধর্মচর্চা বাধাগ্রস্ত হবে মনে করে, তাদের সঙ্গে জনগণের বাস্তব জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। তা যদি থাকত তাহলে তারা দেশের অনেক মানবিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করত। লাঠিসোটা নিয়ে বের হয়ে অন্য অনেক দাবি তুলে মিছিল করত। দ্রব্যমূল্য বাংলাদেশে এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে এবং দ্রুত এর অবস্থা যেভাবে আরও খারাপ হচ্ছে সেটাই এই মুহূর্তে জনগণের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মানুষের কাজ নেই, কাজ থাকলেও উপযুক্ত মজুরি নেই, জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, এসব বিষয়ে ‘ইসলামের মর্যাদা রক্ষাকারী’ মোল্লাদের কোন চিন্তাভাবনা, উদ্বেগ ও কর্মসূচি নেই! কোন আন্দোলন নেই!! অথচ সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা থাকা না থাকার উল্লেখের চেয়ে এই বাস্তব সমস্যাই জনগণের আসল সমস্যা। দেশের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে সংবিধানের কোন খবর নেই। শুধু যে এতে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয় নিয়ে তারা কিছুই জানেন না তা নয়। এই সংবিধান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে কলংকিত করে একটি ফ্যাসিস্ট দলিলে পরিণত হয়েছে এর কোন খবরও তাদের জানা নেই।

মোল্লারা নিজেদের ইহজাগতিক স্বার্থে আজ ইসলামের মর্যাদা রক্ষার এমনকি আল্লাহর মর্যাদা রক্ষার (!!!) জন্য লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামা এবং সংবাদপত্রে এসবের বড় রকম প্রচার থাকার ফলে রাজনীতিতে এর একটা প্রভাব পড়ছে। সংবিধানে ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের’ কথা না থাকলেও এতে বিসমিল্লাহ রাখা হয়েছে এবং তার চেয়ে বড় কথা এরশাদের আমলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষণা করে যে সংশোধনী সংযোজন করা হয়েছিল, সেটাও অটুট আছে। এসবই হল রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধিরই এক একটি দিক। বাংলাদেশে সমগ্র শাসকশ্রেণী এবং তাদের রাজনৈতিক দলগুলো যতই দেউলিয়াত্বপ্রাপ্ত হচ্ছে ততই সব রকম পশ্চাৎপদ ধারা তারা নতুনভাবে আবার আমদানি করছে। রাজনীতিতে ধর্ম চিন্তাও এ আমদানির একটা অংশ।

পাকিস্তানি আমলে ধর্মীয় রাজনৈতিক চিন্তা, সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনায় ধর্মের প্রভাব মোকাবেলা যেভাবে করা হতো তাতে সাধারণভাবে প্রগতিশীলতার শক্তি বৃদ্ধি হতো ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনার প্রভাব কমে আসত। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে তথাকথিত সেক্যুলারপন্থী ও প্রগতিশীলদের আচরণ একেবারে ভিন্ন। এরা যতই ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, কাজ করছেন, ততই তার প্রভাব হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে!! এর থেকেই বোঝা যায়, যেভাবে এ কাজ করা হচ্ছে তার মধ্যে গুরুতর ভ্রান্তি আছে অথবা এ কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে এগিয়ে নেয়ার চক্রান্তেরই অংশ। এ কাজ করা হয়ে থাকে দেশে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্তি বৃদ্ধি করে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তা প্রতিহত করার দুষ্ট উদ্দেশ্যে। যাতে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলরা, ধর্ম ব্যবসায়ীরা আরও শক্তি সঞ্চয় করে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামতে পারে এজন্য ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক উগ্র কথাবার্তা এমনভাবে বলা হয় যার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চাৎপদ ধর্মীয় শক্তি খর্ব না হয়ে আরও জোরদার হয়। এ রকম ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটতে দেখা যায় যার এক দৃষ্টান্ত দুই-একদিন আগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার একটি স্কুলের এক ঘটনা।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় একটি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক তার ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে হজরত মুহাম্মদকে (সাঃ) ছাগলের সঙ্গে তুলনা করে!!! এর মধ্যে এই হারামজাদার ঔদ্ধত্যের পরিচয় তো আছেই, তাছাড়া এটা মনে করার কারণ নেই যে, এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ধরনের কাজ করা হয়, যাতে ধর্মীয় উম্নাদনা দেশে আরও বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। টুঙ্গিপাড়ায় এ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশের অন্যত্রও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যারা নিজেদের সেক্যুলার বলে দাবি করে তারা এবং যারা ধর্মীয় রাজনীতির চর্চা করে তারা, উভয়েই যেভাবে ধর্মের ব্যবহার করে তাতে দেশজুড়ে পশ্চাৎপদতার পুনরুজ্জীবন হচ্ছে এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়ছে ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতির চরিত্র বিপজ্জনক, কারণ এভাবে পশ্চাৎপদতার শক্তি বৃদ্ধি, রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি দেশের জনগণের সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রেই যে শুধু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে তাই নয়; এ পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রেও মারাত্মকভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ১৭/০৭/১১]

শেখ হাসিনার ভালোর পসরা বদরুদ্দীন উমর

বিগত ২৭ জুন ২০১১ তারিখে ‘ভালোর পসরা’ নামে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রচনা একইসঙ্গে ঢাকার বেশ কয়েকটি প্রথম সারির বাংলা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। একইসঙ্গে এই ধরনের কোনো রচনা সাধারণত প্রকাশিত হয়ে থাকে কোনো বিশেষ দিবস উদযাপন উপলক্ষে সরকারি বিজ্ঞাপন হিসেবে। ওপরে উল্লিখিত রচনাটি কোনো সরকারি বিজ্ঞাপন না হলেও অনেকগুলো পত্রিকায় এটি একইসঙ্গে ছাপার কারণ এটি পত্রিকাগুলোতে পাঠানো হয়েছে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। এদিক দিয়ে রচনাটিকে বলা চলে বিনাপয়সায় প্রকাশিত এক ধরনের বিজ্ঞাপন। ক্ষমতায় থাকার সুবিধা অনেক!

শেখ হাসিনা অবশ্যই একজন সুলেখিকা। কিন্তু ‘ভালোর পসরা’ রচনাটি তিনি যেভাবে শুরু করেছেন ‘ভালো চাই, ভালো ভালো নেবেন গো ভালো? আরও ভালো’ এর মধ্যে হাল্কা রসিকতার ভঙ্গিতে যে অশ্লীলতাটুকু আছে সেটা এতে না থাকলেই একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মানানসই হতো। কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলে বিশেষ লাভ আছে মনে হয় না, কারণ এটা তাঁর নিজস্ব স্টাইলের ব্যাপার!

এই রচনার মূল বিষয় দুটি। প্রথমত. নিজের সরকারের আমলে তিনি যেসব কাজ করেছেন তার একটা তালিকা প্রদান করা। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, তিনি যতই ভালো কাজ করে যান এক শ্রেণীর লোকের কাছে তার কোনো স্বীকৃতি নেই। উপরন্তু এরা তাঁর ও তাঁর দলের সব রকম ভালো কাজেরই নিন্দুক। এঁদের সম্পর্কে তিনি বলছেন, ‘লেখালেখি, মধ্য রাতের টেলিভিশনে টক শো, গোল টেবিল, লম্বা টেবিল, চৌকো টেবিল, সেমিনার কোথায় নেই তারা? বোঝা যায় এসব লেখালেখি ও আলোচনাতে হাসিনার বেশ অসুবিধা হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবে বিরক্তিও হচ্ছে। এই বিরক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘তাদের এই কথার ফুলঝুরি কি সবসময় অব্যাহত থাকে?’ সব সরকারের আমলে? না, তা শোনা যায় না। যেমন ধরুন সামরিক সরকারগুলোর সময় তাদের কলমের কালি বা রিফিল থাকে না। কলম চলে না। মুখে কথা থাকে না।’ (সমকাল, যুগান্তর, সকালের খবর, কালের কন্ঠ ইত্যাদি ২৭.৬.২০১১)

এটা কি ঠিক? আওয়ামী-বাকশালী শাসন আমলে মাত্র চারটি সরকারি ও সরকার সমর্থিত পত্রিকা ছাড়া সব পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ থাকায় ও সভা-সমিতি, মিছিল, রাজনৈতিক সংগঠন ইত্যাদির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার সময় ছাড়া অন্য কোনো সরকারের আমলে সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখি, প্রকাশ্য আলোচনা ইত্যাদি বন্ধ থেকেছে? এটা ঠিক যে, অনেক মতলববাজ লোক সে সময় লেখালেখি করেননি বা কথাবার্তা বলেননি। কিন্তু কেউই সেটা করেননি এটা সত্যের এক মহা অপলাপ ছাড়া আর কী? হতে পারে এই অপলাপ ইচ্ছাকৃত অথবা হতে পারে অজ্ঞতার কারণে। কিন্তু যা সত্য নয় তার উচ্চারণ যে কোনো কারণেই হোক, সত্যের অপলাপ ও মিথ্যার প্রচার ছাড়া আর কী?

এখানে অবশ্য এটা বলা দরকার যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে যারা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন আওয়ামী-বাকশালী নেতৃবৃন্দ, বড় ছোট মাঝারি সব স্তরের নেতৃবৃন্দ। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে অতি নিষ্ঠুরভাবে সামরিক বাহিনীর মধ্যে অবস্থিত কিছু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট ও দুষ্টপ্রকৃতির অফিসার সপরিবারে হত্যা করলেও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঢাকা অথবা দেশের অন্যত্র কোনো মিছিল বের করতে, ইস্তাহার দিতে, দেয়ালে চিকা মারতে অথবা অন্য কোনো উপায়ে সামান্য প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। দুই-এক জায়গায় ছোটখাটোভাবে সে রকম কিছু যদি হয়েও থাকে তার কোনো প্রভাব কোথাও ছিল না। এদিক দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে চরম কাপুরুষ এবং নিজেদের নেতা ও দলের প্রতি বেঈমান ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। শুধু সপরিবারে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডই নয়, জেলের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতার নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এই নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। সামরিক শাসনের সময় কেউ কোনো সময় মুখ খোলেনি; একথা বলার সময় একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর নিজের দলের উপরোক্ত কাপুরুষতা, সুবিধাবাদ ইত্যাদির কথা স্মরণ রেখেই অন্যদের সমালোচনা করা উচিত। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর দলের বেঈমানদেরই সম্পর্ক ছিল। এই ক্রাইমের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল একমাত্র আওয়ামী লীগেরই নেতৃত্বের একটি অংশের সঙ্গে। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর লাশ তাঁর বাসভবনে সিঁড়ির ওপর পড়ে থাকার সময়েই জেলে নিহত চার নেতা ছাড়া শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন তত্কালীন আওয়ামী-বাকশালী সরকারের সব মন্ত্রীই খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথগ্রহণ করে বিশ্বের ইতিহাসে বড় ধরনের রাজনৈতিক বেঈমানি ও কেলেঙ্কারির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন একথা শেখ হাসিনা নিজেইবা কীভাবে বিস্মৃত হতে পারেন? তিনি যখন অন্যদের সমালোচনা করেন তখন কেন তিনি নিজেদের দলের এ ধরনের অপকর্ম ও কেলেঙ্কারির বিষয় আড়াল করার চেষ্টা করেন? কিন্তু তিনি যতই এসব আড়াল করার চেষ্টা করেন, ঐতিহাসিক তথ্য ও সত্য চিরকাল আড়ালে থাকার জিনিস নয়।

সামরিক সরকারগুলোর সময়, বিএনপির সরকারের সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমন লেখক ও রাজনৈতিক লোকদের দুর্ভিক্ষ থাকেনি যাঁদের ‘কলমে কালি থাকেনি’, অথবা ‘কলমে রিফিল থাকেনি’। তাঁদের কলমে কালি ও রিফিল ঠিকই থেকেছে এবং তারা এইসব সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত থাকেননি। তথ্যের ব্যাপারে বেপরোয়া না থেকে তথ্য সন্ধান করলেই তাঁর এই বক্তব্যের অসারতা তিনি সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

আসলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়েই একে অন্যকে নিজের অবিসংবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু হিসেবে মাথার মধ্যে টার্গেট করে রাখায় তাঁদের বৃত্তের বাইরে যে অন্য কোনো শক্তি ও ব্যক্তিবর্গের অস্তিত্ব আছে এটা চিন্তায় ধারণ করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। যেহেতু শেখ হাসিনা একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখিকা, পণ্ডিত ও বক্তা হিসেবে খালেদা জিয়ার থেকে অধিকতর প্রবল ও প্রতিভাধর এ কারণে তাঁর কথাবার্তার মধ্যেই এই বৃত্তবদ্ধতা বেশি করে পাওয়া যায়। তিনি ধরেই নেন যে, তাঁর ও তাঁর সরকারের সমালোচকরা সবাই বিএনপির লোক, অথবা বিএনপির সমর্থক!! তাঁদের শ্রেণীর বাইরে দেশে অন্য কোনো শ্রেণীর লোক ও সেই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী এমন রাজনৈতিক দল ও লেখক আছেন যাঁরা আওয়ামী লীগের প্রবল সমালোচক হলেও যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বা শাসক শ্রেণীর অন্য কোনো দলের ধামা ধরেন না; এই বাস্তব চিন্তার ক্ষমতা মনে হয় প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেই।

‘ভালোর পসরা’ শীর্ষক রচনাটিতে আসলে শেখ হাসিনার নিজেরও উদ্দেশ্য হলো নিজের ভালোর পসরা সাজিয়ে তা বিক্রির ব্যবস্থা। তাঁর এইসব ভালোর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। আসলে ওই শান্তি চুক্তির কৃতিত্ব শেখ হাসিনার নয়। ভারত সরকার নিজের স্বার্থে হাসিনাকে দিয়ে এই চুক্তি করিয়েছিল। ত্রিপুরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল ঘাঁটি থাকায় ওই অঞ্চলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে তাদের যাতায়াত ছিল। সীমান্তের মধ্যে অনেক ফাঁকফোকর ছিল। সেগুলো দিয়ে উলফা, মিজো ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সরকারবিরোধী দলগুলোর লোকজনও বাংলাদেশে প্রবেশ করত। এতে ভারতের অসুবিধা হচ্ছিল। তারা এই সীমান্ত সিল করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জনসংহতি সমিতির ঘাঁটি সেখানে থাকায় সীমান্ত সিল করা, যাতায়াত বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। এজন্য ভারত সরকার স্থির করে ত্রিপুরায় জনসংহতি সমিতির ঘাঁটি বন্ধ করে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে। এই মূল কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর কোনো লাভ হয়নি। লাভ হয়েছে সন্তু লারমা ও তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠ লোকের। তাঁরা গদিনসীন হয়ে অনেক হালুয়া-রুটি খাচ্ছেন। কিন্তু হালুয়া-রুটি খাওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের কোনো লাভ এর ফলে না হওয়ায়, চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় তিনি মাঝে মাঝে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিচ্ছেন ও সভাসমিতিতে বক্তৃতা করছেন। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ১৯৯৭ সালে চুক্তি সই হলেও চুক্তি এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এর ফলে সন্তু লারমা গদিনসীন হয়ে হালুয়া-রুটি খাচ্ছেন এবং শেখ হাসিনা এই শান্তি চুক্তি দেখিয়ে নোবেল পুরস্কারের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় জোর তদবির করছেন। না করবেনইবা কেন? মুহাম্মদ ইউনূস শান্তির জন্য কোনো কাজ না করে সাম্রাজ্যবাদীদের কৃপায় ও তাদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে যদি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন তাহলে ভুয়ো চরিত্রসম্পন্ন হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি করে হাসিনাইবা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অযোগ্য হবেন কেন? তবে সাম্রাজ্যবাদীদের খেদমতের জায়গাটা তিনি কতখানি পাকা করতে পারেন এবং তাঁকে এর জন্য তারা কতখানি যোগ্য মনে করেন এর ওপরই নির্ভর করবে তাঁর ভাগ্যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের শিকে ছেঁড়া।

শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ঠিক কী লাভ বা উপকার হয়েছে জানা নেই। তবে এর দ্বারা শেখ মুজিব যাঁর বা যাঁদের আসল পিতা তাঁদের লাভের যে একটা ব্যাপার আছে এটা অস্বীকারের উপায় নেই। শেখ হাসিনা তাঁর নিজের সরকারের সময় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের অর্থাত্, জীবিত দুই কন্যার নিরাপত্তা দেয়ার জন্য’ একটা আইন পার্লামেন্টে পাস করিয়েছিলেন। একথা তিনি তাঁর আলোচ্য রচনাটিতেই বলেছেন। এখানে উল্লিখিত ‘নিরাপত্তার’ উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবের দুই কন্যার জন্য বাসভবন সরকারিভাবে বরাদ্দের ব্যবস্থাও হয়েছিল। শেখ রেহানাকে ধানমন্ডির একটি বাড়ি দেয়া হলেও শেখ হাসিনা তাঁর মন্ত্রিসভাকে দিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন খোদ গণভবন, যা ব্যবহৃত হয়ে আসছিল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ভবন হিসেবে। এ প্রসঙ্গে হাসিনা তাঁর রচনায় বলছেন, ‘আমার নামে ছড়ানো হয় আমি গণভবন এক টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি। কেউ কি কোনো প্রমাণ দেখাতে পেরেছিল? পারেনি।’ একথা বলে মনে হয় হাসিনা এক বিরাট ধর্মযুদ্ধে জয়লাভ করেছেন!

এক টাকা দিয়ে গণভবন কেনার কোনো প্রমাণ কারও কাছে নেই, কারণ তাঁর মন্ত্রিসভায় তাঁর জন্য গণভবন বরাদ্দের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পরই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চারদিকে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এমনিতেই তাঁর সরকার ও দলের জনপ্রিয়তা তখন ছিল শোচনীয় অবস্থায়, তার ওপর জনগণের এই শতকোটি টাকার সম্পত্তি এভাবে নিজেদের মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাস করে আত্মসাতের চেষ্টায় তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগের মধ্যেও ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। অন্য কারণ বাদ দিয়েও হাসিনা যদি নির্বাচনের সময় গণভবন দখল করে সেখানে বাস করতেন তাহলে তাঁদের দলের পক্ষে বিশ-পঁচিশটি আসন পাওয়া পর্যন্ত দুঃসাধ্য হতো। সেই পরিস্থিতিতে প্রবল আওয়ামী লীগ সমর্থক দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদকীয় বিভাগ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানানো হয় যাতে তাঁদের পত্রিকায় আমি হাসিনা কর্তৃক গণভবন আত্মসাত্ চেষ্টার বিরুদ্ধে লিখি। তাঁদের সেই অনুরোধে অবাক হয়ে আমি বললাম, আপনাদের পত্রিকা আওয়ামী লীগ সমর্থক নয়? আপনারা তো জানেন জনগণের সম্পত্তি এভাবে যে কেউই আত্মসাত্ করতে চেষ্টা করলে আমি কী লিখব। তাহলে জনকণ্ঠে আপনারা আমার লেখা ছাপবেন কীভাবে? আমি অবাক হয়ে তাঁদের কাছে শুনলাম, ‘আপনি এ বিষয়ে কী লিখবেন এটা আমরা খুব ভালোভাবেই জানি এবং জেনেশুনেই আপনাকে আমরা এ অনুরোধ করছি। আপনি যা ইচ্ছা ও যেভাবে ইচ্ছা লিখুন।’ জনকণ্ঠের জন্মলগ্ন থেকেই আমি তাতে লিখতাম। হঠাত্ করে পত্রিকাটি চরম আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়ে ওঠার জন্য লেখা বাদ দিই। এখন তাদের অনুরোধে আমি আবার একবার লিখলাম। আমার লেখার একটা প্রভাব যে জনমতের ওপর পড়েনি, এটা আমি বলব না। হাসিনার গণভবন ত্যাগ না করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চারদিকে তো বিক্ষোভ শুরু হলোই, এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও এর প্রবল বিরোধিতা হলো আসন্ন নির্বাচনে বিশেষ করে এর কারণেই ভরাডুবির আশঙ্কা থেকে। সেই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা গণভবন ছাড়তে বাধ্য হলেন। এটাই হলো এ ব্যাপারে সত্য ঘটনা। এর জন্য হাসিনা গণভবন এক টাকায় কিনেছিলেন কি-না, তার প্রমাণের কোনো প্রয়োজন তো নেই-ই, এমনকি প্রাসঙ্গিকতাও নেই!

এটা ঠিক যে, বিএনপির ২০০১-০৬ সালের সরকারের সময় হাওয়া ভবন থেকে গ্রাম্য মোড়লী কায়দায় অনেক দুর্নীতি করা হয়েছিল। সেসব দুর্নীতি মানুষ হতে দেখেছিল চোখের সামনে। কিন্তু আওয়ামী লীগ দুর্নীতিবাজ হিসেবে অনেক চালাক। তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতি করে থাকেন হাওয়াই পদ্ধতিতে, অনেক বেশি চালাকির সঙ্গে। এজন্য তাদের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া দুঃসাধ্য, প্রায় অসম্ভব। কিন্তু দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব হলেও দুর্নীতি মিথ্যা হয় না। আওয়ামী লীগের লোকদেরও সব দুর্নীতি যে চালাকির সঙ্গে করা হয় এমন নয়। তাদের মধ্যে চোর-দুর্নীতিবাজের অভাব নেই।

মাত্র কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা নিজে জাতীয় সংসদের মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টিসহ তাঁর দলের সংসদ সদস্যদের লক্ষ্য করে বলেছেন, তাদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে নয় হাজার করে টাকা এলাকায় অফিসের জন্য দেয়া হলেও তারা সে টাকা খরচ না করে পকেটে রাখেন। এর থেকে স্পষ্টভাষায় চোরকে চোর আর কীভাবে বলা যায়? বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীর লোকরা দুর্নীতিবাজ। কিন্তু আওয়ামী লীগের মহাজোটভুক্ত লোকরা বিশেষত, আওয়ামী লীগের লোকরাও যে সাধু নয়, চরম দুর্নীতিবাজ এটা তো শেখ হাসিনার উপরোক্ত বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। যারা নির্ধারিত কিছু কাজের জন্য প্রতি মাসে পাওয়া সামান্য নয় হাজার টাকা নিয়মিতভাবে পকেটস্থ করছেন তারা নিজেদের দল ক্ষমতায় থাকার সময় দুর্নীতি না করে বসে বসে তসবি গুনছেন একথা কে বিশ্বাস করবে?

শেখ হাসিনার ‘ভালোর পসরা’য় তিনি নিজে যা লিখেছেন তার সবকিছু নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। লেখা এমনিতেই বড় হয়ে যাচ্ছে। তবে আর দুই-একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কারও এমন কথা বলা একেবারেই ঠিক নয় যা কেউ বিশ্বাস করে না এবং যিনি একথা বলছেন তিনিও বিশ্বাস করতে পারেন না। এই বক্তব্য হাস্যকর হলেও একে হাস্যকর বললে উচিতমত বলা হয় না। এ হলো জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। সব রকম দ্রব্য ও সেবার (যাতায়াত, চিকিত্সা ইত্যাদি) মূল্য বৃদ্ধিতে চারদিকে যেখানে গরিব মানুষ, মধ্যবিত্ত জনগণের নাভিশ্বাস উঠছে, তাদের জীবন বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হচ্ছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সুখাসনে বসে শেখ হাসিনা বলছেন তারা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন!! তারা বাংলাদেশের মানুষকে কী মনে করেন? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কার্যত নিয়ন্ত্রণ না করে এসব কথা বলার পরও কি জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের বাক্স ভর্তি করবে?

তিনি বলেছেন, তার সরকার ‘কোনো ঘটনা ঘটলে অপরাধী যে-ই হোক, সরকার সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ এর থেকে বড় মিথ্যা আর কী হতে পারে! র্যাব-পুলিশ নিয়মিতভাবে নিরীহ লোকদের হত্যা করলেও তার কোনোটিরই আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি। কেউ তার জন্য শাস্তি পায়নি। তাদের ছাত্রলীগের কর্মীরা এখন দেশের অন্যতম সন্ত্রাসী জঙ্গি বাহিনী। তাদের অসংখ্য অপরাধের কি শাস্তি হচ্ছে? যাদের হাসিনা নিজেই চোর হিসেবে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করছেন তাদের জন্য কি শাস্তির ব্যবস্থা হচ্ছে? কাজেই অপরাধী যে দলেরই হোক, তার শাস্তি হচ্ছে, এসব বস্তাপচা কথা শুনতে শুনতে মানুষের এমন অবস্থা হয়েছে যে, যারা এসব কথা বলবে জনগণ তাদের বিরুদ্ধে আরও বেশি বিরক্ত হবে, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। বাস্তবত হচ্ছেও তা-ই।

শেষ করার আগে শ্রমিকদের সম্পর্কে হাসিনা যা বলেছেন, সেটা উল্লেখ করা দরকার। তিনি মাসে ১৫০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির কথা বলে নিজেদের সরকার ও গার্মেন্ট মালিকরা কত মহত্ ও শ্রমিকবন্ধু এটা দেখাতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, একমাত্র আমাদের দেশেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের কারখানায় আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা আছে। এভাবে নিহত শত শত গার্মেন্ট শ্রমিককে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কোনো সরকারই দীর্ঘদিন কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। শ্রমিকদের নিরাপত্তার উপযুক্ত ব্যবস্থা এখনও হয়নি। তারা জাতির জনকের কন্যা না হতে পারে কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।

মজুরি বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তিন হাজার টাকার এখন কী মূল্য? এই টাকায় একটি খুব ছোট সংসারও বর্তমান অবস্থায় কীভাবে চলতে পারে? কাজেই গার্মেন্ট শ্রমিকরা দীর্ঘদিন পর তুচ্ছ বেতন বৃদ্ধির পরও মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগের থেকে ভালো অবস্থায় নেই। এ নিয়ে আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে এখানে বলা দরকার, শ্রমিকদের এভাবে জীবন্মৃত অবস্থায় রাখলেও বিএনপি, ফখরুদ্দীন সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ছয় বছরের শাসন আমলে গার্মেন্ট মালিকদের এক লাখ কোটি টাকারও বেশি শুল্কছাড় সুবিধা দিয়েছে। (কালের কণ্ঠ ২২.৬.২০১১) এটা হলো এ বছর বাংলাদেশের বাজেটের মোট পরিমাণের দুই-তৃতীয়াংশ!!! পাঁচটি খাতে এই বিশাল আকারে যারা মালিকদের এই ভর্তুকি দিয়েছে তারা জনগণের, শ্রমিকদের বন্ধু না শত্রু? তারা কি দেশের বন্ধু না শত্রু? শেখ হাসিনা ঠিকই বলেছেন, ‘ব্যবসায়ীরা এত শান্তিতে কোনোদিন ব্যবসা করতে পারেনি।’ এই সত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সামান্য ক্ষমতাও আমাদের নেই। ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের শাসনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তারই পরিণত চেহারা আমরা এখন দেখছি। বাংলাদেশ এখন কোনো ধরনের জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নয়, পুরোপুরিভাবে সাম্রাজ্যবাদকবলিত ব্যবসায়ীদের দ্বারাই শাসিত হচ্ছে। শাসক শ্রেণীর প্রত্যেকটি দল, তাঁদের জাতীয় সংসদ, তাঁদের সরকার, তাঁদের আমলাতন্ত্র, তাঁদের বিভিন্ন ধরনের বাহিনী সবকিছুই এখন ব্যবসায়ী শ্রেণীর অন্তর্গত। বাংলাদেশ এখন ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্য! এই স্বর্গরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীই হলেন শেখ হাসিনা।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ৩০/০৬/১১]