Friday, August 12, 2011

চলমান বিশ্বায়নের উপজাত ঘাতক ব্রেইভিক ড. মাহবুব উল্লাহ

কবি বলেছিলেন, ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে’। আমাদের এই মর্ত্যলোকের জীবন অত্যন্ত আনন্দের। আনন্দের এই মূল্য আমরা বুঝি, কারণ আনন্দের পাশেই আছে বেদনা। রাতে আঁধার না থাকলে দিনের আলোর মূল্য উপলব্ধি করা যেত না। স্বর্গলোকে নিরন্তর আনন্দ ও সুখের প্রবাহ বয়ে চলে। সেখানে কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, ব্যথা নেই, বেদনা নেই। তাই স্বর্গলোকের আনন্দটা প্রচণ্ড একঘেয়েমিপূর্ণ। স্বর্গের সুখের কী মূল্য; সেখানে বেদনা নেই বলে সেই সুখ হয়তো উপভোগ্য হয় না। আমরা কেউ স্বর্গলোকে যাইনি। স্বর্গলোকের অভিজ্ঞতাও আমাদের জানা নেই। কিন্তু মর্ত্যলোকে আনন্দ ও বেদনার পালাক্রমে আবির্ভাব ও তিরোধান আনন্দানুভূতিকে করে তোলে অনির্বচনীয়, পরম উপভোগ্য। সে কারণেই কবি সুন্দর ভুবন থেকে মরতে চাননি। কিন্তু আজকের এই পৃথিবী যেভাবে হলাহল, বিদ্বেষ, ক্রোধ ও ঘৃণায় আকীর্ণ হয়ে পড়েছে, সেই পৃথিবীকে কি আর সুন্দর পৃথিবী বলা যায়? এখন যা ঘটছে তাকে নিছক বেদনাবিধুর ঘটনা বললেও যথেষ্ট হয় না।

নরওয়ের রাজধানী অসলো নগরীতে গত ২২ জুলাই ঘটেছিল শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ। এতে প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ আশপাশের কয়েকটি ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণে কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়েছেন। প্রায় একই সময়ে রাজধানী থেকে দূরে একটি দ্বীপে ক্ষমতাসীন দলের একটি সম্মেলনে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ৮৫ জন। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জানতে আমাদের হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে। ন্যাটোর সদস্য দেশ নরওয়েতে এর আগে কখনও এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে আফগান যুদ্ধে জড়িত হওয়ার পর থেকে কখনও কখনও আল কায়েদার হুমকির মুখে পড়েছে দেশটি। না, বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণের জন্য আল কায়েদা জড়িত নয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে তার নাম হলো এন্ডার্স বেহেরিং ব্রেইভিক। চিন্তা চেতনায় ব্রেইভিক একজন খ্রিস্টান চরমপন্থী। অসলোর বোমা হামলা ও উটোয়া দ্বীপে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনার সঙ্গে ইউরোপে চরমপন্থীদের জাগরণের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলেছেন, ইউরোপে মুসলিম অভিবাসী ও ইসলামের বিরুদ্ধে কী পরিমাণ বিদ্বেষ দানা বাঁধছে তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সহজেই অনুমান করা যায়। আত্মস্বীকৃত হামলাকারী ব্রেইভিক হামলা চালানোর আগে তার নিজের লেখা দেড় হাজার পৃষ্ঠার যে বক্তব্য ইন্টারনেটে পোস্ট করেছিল, তাতে ইউরোপে অভিবাসী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র বিষোদগার করেছে। ব্রেইভিক নিজে নরওয়ের ডানপন্থী দল প্রগ্রেস পার্টির সঙ্গে একসময় সক্রিয় ছিল। এই দলটি চরম মুসলিম বিদ্বেষী। ইউরোপের দেশে দেশে চরম দক্ষিণপন্থীরা মুসলিমবিরোধী বক্তব্যকে পুঁজি করে সাফল্য অর্জন করে চলেছে। প্যারিসের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস কোহেন বলেন, ‘এই ঘটনা ইউরোপের ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী আবহের অংশ। এটি এমন এক দর্শন জগতের অংশ, যেখান থেকে ব্রেইভিকের মতো লোক প্রেরণা পাচ্ছে। ইদানীংকালে দেখা গেছে ইতালি থেকে ফ্রান্স, ফ্রান্স থেকে ফিনল্যান্ড তথা ইউরোপজুড়েই ডানপন্থী দলগুলো রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলছে। ডানপন্থীরা ইউরোপের বাইরের দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বংশোদ্ভূত লোকদের ইউরোপে অভিবাসন পাওয়ার বিষয়ে তারা ঘোর বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে গত বছরের নির্বাচনে সেখানকার ফ্রিডম পার্টি ‘ইসলাম হটাও’ স্লোগান দিয়ে ১৫.৫ শতাংশ ভোট পেতে সক্ষম হয়। সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে মাত্র ৪টি মসজিদ রয়েছে। সেখানে মসজিদে মিনার তৈরি নিষিদ্ধ হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের পর মনে করা হয়েছিল, ইউরোপ শতবছরের যুদ্ধ ও সংঘাতকে পেছনে ফেলে এক মহামিলনের সেতুবন্ধে আবদ্ধ হয়েছে। ইউনিয়ন গঠনের ফলে ইউরোপের ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াতে বাধাবিঘ্ন উঠে গেছে। কিন্তু গত মে মাসে ডেনমার্কের সরকার সীমান্ত পুনর্নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কার্যকর করে। ড্যানিশ পিপলস পার্টির দাবি, তাদের আন্দোলনের কারণেই সরকার অবাধ সীমান্ত নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেখানে ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলবে রবে না দূরে’ অবস্থার জন্ম দিচ্ছে, ঠিক তখনই রাজনীতিতে চরমপন্থার উত্থান অর্থনৈতিক সংঘবদ্ধতার বাস্তবতাকে কুঠারাঘাত হানছে। আঘাতের এই উত্স উগ্রজাতীয়তাবাদ, স্বরূপ অন্বেষণে অস্থিরতা, পরিচয় মুছে যাওয়ার ভীতিতে সন্ত্রস্ততা। এমনকি সংকীর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ হয়ে উঠেছে বড় রকমের বাধা। বিদেশি অভিবাসীদের স্থায়ী অভিবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ দূরদৃষ্টিহীন অর্থনৈতিক সংকীর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের স্থানীয় একদল পরজাতি পরধর্ম বিদ্বেষী লোক মনে করছে অভিবাসীরা তাদের কর্মসংস্থানে ভাগ বসাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোয় জনমিতিক (Demographic) বিন্যাসে বিশাল এক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের ফলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশু ও তরুণদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্তভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বার্ধক্য ও জরাগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা। ফলে অর্থনীতির চাকা চালু রাখার জন্য কর্মঠ তরুণ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক বৃদ্ধ মানুষ ওয়েলফেয়ার ফান্ডের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছেন। রাষ্ট্রের পক্ষে কর আয়ের জোগান দিয়ে বৃদ্ধ কিন্তু কর্মহীন লোকের বোঝা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এসব দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অভিবাসীরা বিপুল অবদান রাখছে। অভিবাসীরা যেমন কর্মঠ, তেমনি কম মজুরিতে কাজ করতেও রাজি। কিন্তু পরধর্ম বিদ্বেষী উগ্রপন্থীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। খোঁড়া অজুহাতে তারা ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পৃথিবীটাকে নরকতুল্য করে তুলছে। ব্রেইভিকের হত্যাযজ্ঞ কূপমণ্ডূকতা, যুক্তি ও বুদ্ধিজাত চিন্তার অনুপস্থিতি, তমসাবাদ ও মৌলবাদের উত্থানেরই অত্যন্ত ভয়বহ বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই মৌলবাদ ইসলামী মৌলবাদ নয়। এটি মুসলিম বিদ্বেষী খ্রিস্টান মৌলবাদ। এত দিন যারা একতরফাভাবে সন্ত্রাসের জন্য মুসলিম নামধারীদের দায়ী করেছেন, এখন তাদের বোধোদয় ঘটলেই হয়।

সন্ত্রাসবাদ মুসলমানদের একক সম্পত্তি নয়। বস্তুত সন্ত্রাসবাদ কিংবা মৌলবাদ যে কোনো ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে এবং অপর ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। গুজরাটের নিধনযজ্ঞ ছিল নিকৃষ্ট হিন্দু মৌলবাদের নিদর্শন। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামাসহ অনেক বড় বড় পণ্ডিত ভেবেছিলেন শীতল যুদ্ধের অবসানের পর পৃথিবী বাজার অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের নিস্তরঙ্গতায় অবস্থান গ্রহণ করে ইতিহাসের অবসান সূচিত করেছে। কিন্তু এখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যা কিছু ঘটছে সেটা ইরাকেই হোক কিংবা আফগানিস্তানেই হোক কিংবা ফিলিস্তিনেই হোক অথবা নরওয়েতেই হোক, তা থেকে স্পস্ট যে আগামী দিনের পৃথিবীতে কী ঘটবে কিংবা পৃথিবী কোন রূপ পরিগ্রহ করবে, সে কথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে পৃথিবীতে আরও অনেক পরিবর্তন আসবে। কার্ল মার্কসের মতো দার্শনিক যিনি পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও গতি-প্রকৃতি নির্দেশ করেছিলেন, তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিলেন। তিনি এ কথাও বলেছিলেন, বিশ্বায়ন যুগপত্ বিপরীতধর্মী শক্তির জন্ম দেবে। প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো একে অপরকে বিনাশ করতে উদ্যত হবে। একদিকে মনে হবে বিশ্বায়নের শক্তি অপ্রতিরোধ্য, অন্যদিকে মনে হবে বিশ্বায়নকে হটিয়ে দেয়ার মতো শক্তিও সমপরিমাণ শক্তিশালী। সুতরাং দ্বান্দ্বিকতায় নতুন Synthesis কী হবে বলা সত্যিই কঠিন।

ব্রেইভিক ঠাণ্ডা মাথার খুনি। সে দাবি করেছে যে সে ঠিক কাজই করেছে। এতগুলো মানুষকে নিজহাতে খুন করে যে স্থির থাকতে পারে, তার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে কীই বা বলা যায়। খুনপিয়াসী এসব লোককে Necrophilous ব্যক্তি বলে মনস্তত্ত্বে চিহ্নিত করা হয়।

যারা Necrophilia-য় আক্রান্ত তাদের Necrophilous বলা হয়। এরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে উত্কট আনন্দ পায়। সমাজতত্ত্ববিদ Erich Fromm তার Anatomy of Human destructiveness গ্রন্থে ধ্বংস সাধনের উন্মত্ততার মনস্তত্ত্বের বিশাল বিশ্লেষণ করেছেন। হিটলার ঠিক তেমন ধরনেরই একজন মানুষ ছিলেন। তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন হিটলারের কার্যক্রমকে গতানুগতিক রাষ্ট্রের যুক্তিতে ন্যায়সিদ্ধ বলা যাবে কি না। তিনি কি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রনায়ক বা সেনাপ্রধানদের থেকে ভিন্নতর ছিলেন, যারা যুদ্ধের সূচনা ঘটায় এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়? এরিখ ফ্রোমের মতে, হিটলার কিছু কিছু ব্যাপার অন্য যে কোনো বৃহত্ শক্তির নেতাদের মতোই ছিলেন। তার যুদ্ধের নীতি একক কোনো ব্যাপার ছিল না। তার বিশেষত্ব হলো তার ধ্বংস উন্মাদনা বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় আনুপাতিক ছিল না।

তার কার্যক্রম বিশেষ করে লাখ লাখ ইহুদি, রুশ এবং পোলিশ হত্যা থেকে শেষ পর্যন্ত সব জার্মানকে নিশ্চিহ্ন করায় তার হুকুম শুধু কৌশলগত উদ্দেশ্য দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাবে না। একে ব্যাখ্যা করতে হবে একজন নরঘাতকতা ব্যাধিতে আক্রান্ত বিকৃত মানসিকতার অভিব্যক্তি হিসেবে। হিটলারকে প্রায়ই একজন ইহুদি বিদ্বেষী ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু তাকে এভাবে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। তিনি নিশ্চিতভাবে ইহুদিবিদ্বেষী ছিলেন এবং সমপরিমাণে ছিলেন জার্মানবিদ্বেষী। তিনি ছিলেন মানববিদ্বেষী। সর্বোপরি তিনি ছিলেন জীবনবিদ্বেষী। আজকের যুগে ব্রেইভিকের মতো একজন খ্রিস্টান মৌলবাদীকে শুধু মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। সে তো হত্যা করেছে তার নিজ ধর্মের ভাইবোনদের। নিষ্ঠুর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে হয়ে উঠেছিল তার নিজ দেশবাসী নরওয়েজীয় বিদ্বেষী। এরকম ঘাতক মানসিকতা চলমান বিশ্বায়নের কোনো উপজাত কি না, সে বিষয়টি সমীক্ষা করতে হবে নিবিড়ভাবে।

mahbub.ullah@yahoo.com
[সূ্ত্রঃ আমার দেশ, ৩০/০৭/১১]

No comments:

Post a Comment