Friday, August 12, 2011

কম খেয়ে খাদ্য সমস্যা সমাধানে বাণিজ্যমন্ত্রীর তত্ত্ব বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী, যিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী পরিবারের লোক, বর্তমান মূল্য বৃদ্ধি ও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মহৌষধ বাতলাতে গিয়ে ৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক মতবিনিময় সভায় জনগণকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনারা কম খান, কম খেলে সমস্যা কমবে। ব্যবসায়ীরা ভেজাল মেশাতে নিরুৎসাহিত হবে। খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে সহজে প্রবেশ করে। আগেকার মানুষ কম খেত বলে বেশিদিন বাঁচত’ (আমার দেশ, সকালের খবর ৫-৮-২০১১)। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই মিলে পদক্ষেপ নিলে দ্রব্যমূল্য ও ভেজাল প্রতিরোধ সম্ভব হবে।’ কিছুদিন আগে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী জনগণকে উপদেশ দিয়েছেন বাজারে একদিন কম যাওয়ার! বাজারে একদিন কম গেলে চাহিদা কমবে এবং চাহিদা কমলে মূল্য বৃদ্ধিও হবে না। এই ছিল তার তত্ত্ব!! এর আগে সাইফুর রহমান ২০০১ সালে গঠিত বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময় বলেছিলেন, ‘চালের দাম বাড়ার জন্য ভাত খেতে না পারলে আপনারা বাঁধাকপি খান!’

এসব বক্তব্যের মধ্যে যে মিল দেখা যায় সেটা শাসক শ্রেণীর মৌলিক শ্রেণীগত ঐক্যের কারণেই ঘটে থাকে। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, আগেকার দিনে লোকে কম খেত বলে বাঁচত বেশি! বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় মনে হয় খুব অশিক্ষিত লোক নয়, কিছু শিক্ষাদীক্ষা অবশ্যই আছে। তাছাড়া কিছুটা জানাশোনা থাকলেও এটা তার জানার কথা যে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু আগের চেয়ে অনেক বেড়ছে। এটা খাদ্যের গুণে নয়। নানা ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কৃত হওয়ার কারণেই আয়ুর এই গড় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এই তথ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য গবেষণা বা পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয় না। এটা বাংলাদশের লোকেরা সাধারণভাবেই জানেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত একজন লোক কিভাবে বলতে পারেন যে, আগেরকার লোক কম খেত বলে তাদের আয়ু বেশি হতো! আসল ব্যাপার হল, গদিতে বসে থাকা এই ভদ্রলোকরা এখন ক্ষমতা মদমত্ত অবস্থায় একেবারে বেপরোয়া। তাছাড়া এ ধরনের কথা তাদের পক্ষেই বলা সম্ভব যাদের জনগণের প্রতি, তাদের সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির প্রতি বিন্দুমাত্র কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। এদের ধারণা, এরা যা বলবেন তাকেই মানুষ শিরোধার্য করবে!! এ দেশের মানুষ তাদের যেভাবে সহ্য করছে তাতে এরা গরু-ছাগল ছাড়া আর কী?

বাংলা ১২৭৬ বা খ্রিস্টীয় ১৭৬৯ সালে কোম্পানির আমলে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় এক প্রলয়ংকরী দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষে শুধু রংপুর অঞ্চলেই মৃত্যু হয়েছিল লক্ষাধিক লোকের। এসব মৃত্যু তো বেশি খাওয়ার জন্য হয়নি। হয়েছিল একেবারে খেতে না পাওয়ার জন্য।

দ্বিতীয় কথা হল, বাণিজ্যমন্ত্রী যেভাবে মানুষকে কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বিশেষত চালের মূল্য কমানোর কথা বলেছেন, তাতে মনে হয় দুর্ভিক্ষ কী কারণে হয় এটিও তার জানা নেই! দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটা ভূমিকা থাকলেও দুর্ভিক্ষ আসলে মানুষেরই সৃষ্টি। ১৭৬৯, ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দুর্বৃত্ত চরিত্রের ব্যবসায়ী ও সরকারি লোকদের দ্বারাই ঘটেছিল। এমনকি ঠিক এই মুহূর্তে সোমালিয়ায় যে দুর্ভিক্ষ চলছে, তাতে খরার একটা ভূমিকা থাকলেও এর একাধিক কারণের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট কারণটিই প্রধান।

বাংলাদেশে এখন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে খাদ্যাভাব হচ্ছে, সে মূল্যবৃদ্ধি কিভাবে হচ্ছে এটা ব্যবসায়ী পরিবারের লোক এবং খোদ ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষে না জানার কথা নয়। এ কারণে তিনিও এটা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে জনগণ, সরকার ও ব্যবসায়ীরা যদি একত্রে মূল্যবৃদ্ধি বন্ধের জন্য চেষ্টা করেন, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব! এখানে সরকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জনগণকেও জড়িত করে তিনি মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বকে লঘুভাবে দেখানোর যে চেষ্টা করেছেন, এটা অসাধুতার দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কী?

একথা ঠিক যে, রমজানের সময় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত খাওয়ার যে চেষ্টা হয় তার ফলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি হয় ও সেই সুযোগে ব্যবসায়ীরা মূল্য বৃদ্ধি করে। এ বিষয়ে রমজান মাসে তারা যদি সংযম করেন, তাহলে ব্যবসায়ীরা অবাধ মূল্যবৃদ্ধির মতো দুর্বৃত্তগিরি করতে পারে না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, জনগণ কম খেলেই বাজার দ্রুত নিয়ন্ত্রিত হবে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারবে না। কারণ রমজানের সময় মূল্যবৃদ্ধির জন্যও না খেতে পাওয়া লোকরা দায়ী নয়।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে খাদ্যদ্রব্যের যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষের, জনগণের, বেশি খাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তারা কোনমতে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যতটুকু খাওয়া দরকার তার চেয়ে কমই খাচ্ছেন। যে শ্রমিকরা মাসে দু-তিন-চার হাজার মজুরি পাচ্ছেন, বা যাদের আয় তার চেয়েও কম তারা দিনে একবার সামান্য খেয়েই থাকছেন। পেটে কোনমতে কিছু ভাত ফেলতে পারলেও তরকারি জোগাড় করা তাদের পক্ষে মুশকিল। অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো ব্যক্তিরা নিজেরা বেশি খান বলে তাদের মনে হচ্ছে যে, কম খেলে বাজারে চাহিদা কমবে এবং চাহিদা-সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্যের দাম কমবে! কিন্তু তারা প্রতিদিন যে পরিমাণ খান ও যত ভালো জিনিস খান তার ধারে-কাছে যাওয়াও বাংলাদেশের শতকরা নব্বই ভাগ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, আগেই বলা হয়েছে, তাদের দু’বেলা ভাত খাওয়ার সংস্থান পর্যন্ত নেই। তরিতরকারিও যে অগ্নিমূল্য তাতে ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু জোগান দেয়াও তাদের পক্ষে এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার।

এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী কর্তৃক জনগণকে কম খেয়ে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা ও ভেজাল বন্ধ করার পরামর্শ জনগণের সঙ্গে উপহাস করা, তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেরা সরকার-ব্যবসায়ী আঁতাতের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির কলকাঠি নেড়ে চলার চক্রান্ত কার্যকর করে চলা ছাড়া আর কী?
বাংলাদেশের জনগণের আজ সমস্যার অভাব নেই। গরিব মানুষের জীবন ছাড়া বাংলাদেশে এখন সব কিছুরই মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। একদিকে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যদিকে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আয় বৃদ্ধি না হওয়ায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় দিন দিন কমছে। এই আয় কমতে থাকার কারণে তাদের বেশি খাওয়ার কোন প্রশ্নই নেই। উপরন্তু এর ফলে প্রতিদিনই তারা নিজেদের খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অবস্থায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হিসেবে বাণিজ্যমন্ত্রী জনগণকে কম খেয়ে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও ভেজাল বন্ধের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার যে কথা বলেছেন সেটা এই দুই ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে তিনি মূল্য বৃদ্ধি ও ভেজালের জন্য জনগণকে দায়ী করে যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে একটি অপরাধতুল্য ব্যাপার। এই অপরাধের জন্য বর্তমান অবস্থায় তার শাস্তির কোন সম্ভাবনা না থাকলেও উপযুক্ত শাস্তি তার প্রাপ্য।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ০৭/০৮/১১]

No comments:

Post a Comment