প্রধান বিচারপতির অতি উচ্চ আসনে দায়িত্ব পালন শেষে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার দিনটিতে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তাঁর দেশের মানুষকে বিরাট স্বস্তিতে রেখে যেতেন যদি তিনি সেদিনই স্পষ্ট করে বলে দিতেন যে, তিনি কোনো অবস্থায়ই জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তথা সরকারপ্রধানের পদ গ্রহণ করবেন না। সেদিন সাংবাদিকদের বেশকিছু প্রশ্নের মধ্যে দুটির উত্তর এই প্রসঙ্গে আবার মনে করা প্রয়োজন। তিনি বলেছিলেন, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী, অর্থাত্ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির দাবি মেনে যার মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলন করা হয়, তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় অবৈধ। এ রায় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদের আগামী দুটো নির্বাচন ওই ব্যবস্থার অধীনেই হতে পারে—এই মতটি যে জাতির মঙ্গলের জন্যই দিয়েছেন, তা রায়টি কয়েকবার পাঠ করলেই বোঝা যাবে। আমরা রায় পড়ে জেনেছি, আপিল বিভাগের ওই মতকে প্রয়োগযোগ্য করার জন্য প্রধান বিচারপতিসহ আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক 'Doctrine of Necessity' (যার নির্গলিতার্থ হলো প্রয়োজনে আপাতদৃষ্টিতে অবৈধ বা আইনবহির্ভূত কাজকেও বৈধ বলে স্বীকার করে নেয়া যায়) আবাহন করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে অবসরযাত্রাকালীন মন্তব্যে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক দেশবাসীকে তাঁদের এই সিদ্ধান্ত যে যথার্থ, তা-ই যেন ফের বোঝাতে চেয়েছেন। অতএব আমরা বলতে পারি, তিনি চাইছেন ওই রায়টিকে সঠিক বলে সবাই যেন মেনে নেন এবং ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা যেন আপাতত যেমন আছে তেমনভাবেই চালু থাকে। মাননীয় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অবশ্যই বলতে পারেন যে এরকম ব্যাখ্যা তাঁর নয়, আমাদের। আসলেও আমরা যা ভাবছি, আমি তা-ই লিখছি।
আমরা এও ভাবছি যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আগামী তিন বছরও যদি চালু থাকে, তাহলে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই সে পদের জন্য প্রথম ডাকটি পাবেন, কারণ বর্তমান বিধান হচ্ছে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন। যদি মাননীয় বিচারপতি খায়রুল হকের পরই বিচারপতি শাহ মোহাম্মদ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হতো, তাহলে অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে যেত। কারণ বিচারপতি আবু নাঈম আগামী নভেম্বরে অবসরে যেতেন এবং সেক্ষেত্রে আগামী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য তিনিই হতেন সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সরকার তাঁকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দিয়ে জ্যেষ্ঠতায় তার পরে ছিলেন যে বিচারপতি, তাঁকে প্রধান বিচারপতি করেছেন। ইনি আগামী নির্বাচনের আগে অবসরে যাবেন না।
অতএব আমরা ধরে নিতে পারি, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও চেয়েছে, যেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়। এদিকে অবসরে যাওয়ার দিন বিচারপতি হক সাংবাদিকদের অপর যে একটি কথা বলেছিলেন, সেটিও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যত্ই বলে দেবে কে হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান। তার মানে তিনিও তাহলে হতে পারেন। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বা সদস্য কোনো দায়িত্বেই দেখতে চাই না। তাঁর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিচারপতি থাকার সময় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন, কাজেই তিনি আদৌ দলনিরপেক্ষ নন। তিনি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ নালিশ মূলত বর্তমানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির। তারা এরই মধ্যে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতেই হবে। তারা বলেছে, অন্যথায় তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। আপিল বিভাগে ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কে রায় হওয়ার আগেই তারা এ দাবি তুলেছে। কারণ তাদের সন্দেহ ছিল, আওয়ামী লীগ সংসদে তাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেবে। এখন বিএনপির অন্য একটি দাবি হলো, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মানবে না। জোর করে তাঁকে ওই পদে বসানো হলেও তারা নির্বাচন বর্জন করবে। শুধু তা-ই নয়, তারা নির্বাচন হতেও দেবে না। যেহেতু আওয়ামী লীগ নিকট অতীতেই এরকম নির্বাচন বয়কট ও বানচাল করেছে, তাই বিএনপি মনে করে তারাও একই কাজ সফলভাবেই করতে পারবে।
তবে আমরা যে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করছি, তার সুস্পষ্ট আরও কারণ আছে। এক তো হচ্ছে, তাঁকে ওই পদে যাতে বসানো যায় দৃশ্যতই সরকার সেভাবে কৌশল নিয়েছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে। এ প্রসঙ্গে অনেকেই আমাদের সমালোচনা করে বলতে পারেন, বিএনপি বিচারপতি কে এম হাসানকে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করার জন্য কৌশল নিয়েছিল, আমরা সেকথা ভুলে যাচ্ছি কেন? আমাদের উত্তর হলো—না, আমরা তা ভুলিনি। তবে আমরা এও ভুলিনি যে, বিচারপতি কেএম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না হতে পারেন, সেজন্য আওয়ামী লীগ রক্তক্ষয়ী ও প্রাণসংহারী লগি-বৈঠার আন্দোলন করেছিল। অনেকে মিলে পিটিয়ে একজনকে হত্যা করার নৃশংস সেই দৃশ্য আমরা টেলিভিশনের কল্যাণে দেখেছি। বিএনপি সেই আন্দোলন অনুকরণ না করলেও হরতাল-অবরোধ ইত্যাদি করার চেষ্টা করতে পারবে। আর নির্বাচন বর্জন তো আছেই। আমরা চাই না যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কারণে দেশে সেরকম অচলাবস্থা ও সংঘর্ষ হোক। আশা করি, তিনিও এরকম অপ্রীতিকর কিছুর উপলক্ষ হওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করবেন।
দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে একদিকে অবৈধ ঘোষণা করে অন্যদিকে আরও দুই নির্বাচনের জন্য (অর্থাত্ ১০ বছর) এটা চালু থাকুক—এই মর্মে তিনি ও আপিল বিভাগে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠ সহযোগী বিচারকরা যে রায় দিয়েছেন তা যে কেবল বহু রাজনীতিবিদ ও আইনজীবীই স্ববিরোধী বলে মনে করছেন তা-ই নয়, দেশের বহু সাধারণ মানুষও এটিকে স্ববিরোধী, যুক্তিহীন ও নীতির দিক থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে করছেন। বহু আইনজীবী ও জনগণের বিরাট অংশ মনে করেন, এতে দেশের জনগণের চোখে সুপ্রিমকোর্টের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে এবং তাতে দেশের উচ্চতম আদালতের খুব ক্ষতি হয়েছে। যেহেতু আপিল আদালতের এ রায় বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই ঘোষণা করছেন, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্বে তাঁকে বসানো হলে ওই পদটির ওপর মানুষের আস্থা থাকবে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। তাছাড়া যে বিচারপতি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন ও এরকম কোনো ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের জড়াতে নিষেধ করেছেন, তিনি নিজে সেরকম সরকারের প্রধান বা সদস্য হবেন কী করে? যদি তা হন, তাহলে কাজটি হবে চরমভাবে অনৈতিক।
তৃতীয়ত, এরই মধ্যে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সম্পর্কে সুপ্রিমকোর্টে সিনিয়র অ্যাডভোকেট পদে এনরোলমেন্টের কাজে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। তিনি যে হাইকোর্টে থাকার সময় ৬০টির অধিক মামলার লিখিত রায় সময়মত দেননি, সেই অভিযোগও উঠেছে। এদিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, জেলা জজকোর্টে চারজন করে বিচারককে একটি এজলাস ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং চারজন করে বিচারককে একই গাড়ি ব্যবহার করতে হচ্ছে। আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম তাঁর দু-তিনদিন পরই এই বিদায়ী প্রধান বিচারপতির সামনেই প্রকাশ করেন, সম্প্রতি সরকার শতাধিক বিচারক নিয়োগ দেয়ায় এজলাস কক্ষের অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছে, তবে শিগগিরই নতুন জেলা আদালতগুলোয় এজলাস কক্ষ তৈরি করা হবে। এতে প্রমাণিত হয়, বিচারপতি খায়রুল হক সমস্যাটির সব দিক না জেনে বা না বুঝেই আইনমন্ত্রীর কথার উত্তর দিয়েছিলেন। কোনো দক্ষ ব্যক্তির তো এরকম আচরণ করার কথা নয়। অতএব সবদিক থেকে বিবেচনা করলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান পদের জন্য বিবেচনার বাইরে রাখাই উচিত। অতীত ও বর্তমানের নানা ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে এবং নৈতিকতার কিছু শক্ত প্রশ্ন উঠে আসছে বিধায় আমরা এসব মন্তব্য করলাম, কারও প্রতি অনুরাগ বা বিরাগবশত নয়।
এদিকে গতকাল থেকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনটি যে পরিবেশের মধ্যে শুরু হলো, তা জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দুশ্চিন্তা কেবল এ কারণে নয় যে, বিরোধী দলের বর্জন দিয়ে অধিবেশন শুরু হলো। উদ্বেগ ও উত্তেজনার একটি প্রধান কারণ হলো, ক্ষমতাসীন দল না জানি সংবিধান সংশোধনের নামে কী অঘটন ঘটায়। একদলীয় শাসনের জন্য যে চতুর্থ সংশোধনী এনেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে, তা পুনরুজ্জীবনের ষড়যন্ত্রের গন্ধ তো আছেই, তাছাড়াও নানানভাবে পুরনো অনেক ঝগড়াকে নতুন করে আবার বাধিয়ে দেয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এদিক থেকে সরকারপক্ষ যদি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্তগুলো অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই জনগণকে জানাত, তাহলে ভালো হতো। সরকারের বোঝা উচিত ছিল যে সংবিধান যেহেতু রাষ্ট্রের সব আইনের ভিত্তি, তাই সংবিধান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তা জনগণকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ নিয়েও দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এখন সবকিছুই রয়েছে সন্দেহের ঘন কুয়াশায় আবৃত। রাজনীতি রয়েছে দম বন্ধ হওয়া অবস্থায়। আশঙ্কা ও উদ্বেগের দ্বিতীয় প্রধান কারণ বাজেট। শেয়ার মার্কেট মহাকেলেঙ্কারি, নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতি, স্থবির বা খুবই ধীর ও অগোছালো উন্নয়ন কর্মসূচি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের অনেকের বাধ্য হয়ে দেশে ফেরত আসা, ডলার পাচার, দুর্নীতি ও সুপারিশ বাণিজ্যের দরুন সত্ নাগরিকদের বঞ্চিত হওয়া। একইসঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিস্থিতির অবনতি—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সিন্ধুর সঙ্গে এবারের বাজেট কোন বিষাদ যোগ করে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। ভূমিদস্যু ও জলদস্যুদের সঙ্গে সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ভাড়া-দস্যুদের সর্বশেষ উত্পাত তো জানিয়েই দিচ্ছে আমরা কী নিদারুণ কার্যকর সরকারের খপ্পরে পড়েছি। একইসঙ্গে চলছে সরকারি উত্পীড়ন—তার যন্ত্রণা জানেন তারা ‘আশি বিষে দংশেছে যারে।’ এ অবস্থায় ভবিষ্যত্ অন্ধকারময়ই মনে হচ্ছে।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ২৩/০৫/১১]
No comments:
Post a Comment