Friday, August 12, 2011

অনুপ চেটিয়া : নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি বাংলাদেশ ড. মাহবুব উল্লাহ

৪ আগস্টের সংবাদপত্র এবং ৩ আগস্টের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের কারাগারে আটক উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম স্বাধীনতাকামী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৩ আগস্ট বুধবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কাছে এ ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন এবং বাংলাদেশ অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করবে। এজন্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কার্যালয়ে জাতীয় চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির বৈঠক শেষে এক প্রশ্নের জবাবে একথা জানান।

৪ আগস্টের সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, গত ২৯-৩০ জুলাই বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়াকে ফেরত দেয়ার অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন বলে জানা যায়। ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই গত সোমবার জানায়, চিদাম্বরম ওই দিন নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুপ চেটিয়াকে যত শিগগির সম্ভব আমাদের হাতে তুলে দিতে অনুরোধ জানিয়েছি।’ ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরাম যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, সেই সময় সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের বিএসএফ কর্তৃক হত্যা সম্পর্কে তিনি অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের কেউ কেউ ভারতে অবস্থান করছে এবং তাদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হবে কিনা প্রশ্ন করা হলে চিদাম্বরম জানিয়েছিলেন, যদি এমন কেউ থেকে থাকে এবং তাদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই ভারত তাদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে। এ প্রসঙ্গে চিদাম্বরমের অবস্থান ছিল বেশ কতগুলো শর্তসাপেক্ষ। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে কোনো আশ্বাস দেননি। কিন্তু আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অবশ্যই অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে। যাই হোক, বিস্ময়ের ব্যাপার হলো চিদাম্বরম-সাহরা খাতুন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিক অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তরের প্রসঙ্গটি দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় এসেছে কিনা সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেননি। চিদাম্বরম নিজেও ভারতে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশের অভিযুক্তদের বা দণ্ডপ্রাপ্তদের ফেরত দেয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনুপ চেটিয়ার প্রসঙ্গটি একেবারেই উল্লেখ করেননি। বাংলাদেশের স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি এ ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন, এমন কথা প্রকাশ করা দূরে থাক। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনও এ ব্যাপারে আলোচ্য সংবাদ সম্মেলনে কোনো মন্তব্য করেছিলেন, এমন কথাও শোনা যায়নি।

বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত কী ভাবছে বা কী করছে, সেসব কথা জানার জন্য অধিকাংশ সময়ই আমাদের ভারতীয় মিডিয়ার শরণাপন্ন হতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্য ইকোনমিস্টের মতো পাশ্চাত্যের সাময়িকীর ওপর নির্ভর করতে হয়। আমাদের দৈনিকগুলো ইচ্ছা হলে খেয়ালখুশিমাফিক ভারতীয় সূত্র উল্লেখ করে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ভারতীয় মিডিয়ার খবরগুলো পুনঃপ্রচার করে। তবে বেশিরভাগ এদেশি পত্রপত্রিকার মনোভাব এ ব্যাপারে খুবই অনীহ। প্রতিবেশী ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে এমন খবর প্রচার ও প্রকাশ থেকে বিরত থাকাই এসব পত্রপত্রিকা শ্রেয় বোধ করে। কারণ সম্ভবত একটি। আর সেটি হলো অন্ধ ভারত প্রেম।

অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি পি চিদাম্বরম যে অনুরোধ করেছিলেন সেটি তিনি প্রকাশ করলেন নয়াদিল্লিতে গিয়ে। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরমের অনুরোধ সম্পর্কে নীরব থাকাই শ্রেয় বোধ করেছেন। কারণ বোধ হয় একটিই। অনুপ চেটিয়া ইস্যুটি অন্তত স্পর্শকাতর। অনুপ চেটিয়া সাধারণ কোনো বন্দি নন। তিনি একটি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা। এই স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারত সরকারের দৃষ্টিতে এমনকি আমাদের সরকারের দৃষ্টিতেও একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার জনগণ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করছিল, তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে আমরা ছিলাম বিচ্ছিন্নতাবাদী; কিন্তু আমাদের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার জন্যই লড়ছিল। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম আরেকটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্য থেকে। সেই রাষ্ট্রটি হলো পাকিস্তান। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ সুদান নামে সার্বভৌম সুদান থেকে আলাদা হয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এর জন্য দক্ষিণ সুদানিরা সশস্ত্র সংগ্রামও করেছে। সশস্ত্র সংগ্রাম, শান্তি আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষর, সব শেষে রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিচিত্র জটিল প্রক্রিয়ায় স্বাধীন দক্ষিণ সুদানের জন্ম। সুদান থেকে আলাদা হয়ে আরেকটি টুকরো স্বাধীন রাষ্ট্রেরও জন্মলাভের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেই রাষ্ট্রটির নাম হবে সম্ভবত দারফুরিয়া।

আমরা পছন্দ করি কিংবা না করি, বাস্তবতা হলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ডিকলোনাইজেশন প্রক্রিয়া এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অনেক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটালেও এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটির আরও খণ্ডীকরণ হয়ে নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটছে। ছোট বড় মাঝারি অনেক দেশেই এ ধরনের খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ভারত তার ব্যতিক্রম হবে কেন। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ শক্তিশালী হওয়ার কারণে ভারতের যেসব অঞ্চলে স্বাধীনতা অর্জনের শক্তিগুলো ক্রিয়াশীল, সেগুলোকে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে কতদিন পর্যন্ত এটা বজায় রাখা সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। উলফা ৮০-র দশক থেকে আসামের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে তারা কিছু বৈদেশিক মিত্রেরও সহায়তা পাচ্ছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় বসার পর বাংলাদেশে পালিয়ে থাকা বেশকিছু উলফা নেতাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় পড়ছি, উলফা নেতাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য ভারত সরকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। উলফা নেতাদের একটি অংশ এই শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ইঙ্গিতও দিচ্ছে। এদের কাউকে কাউকে ভারত সরকার কারাগার থেকে জামিনে মুক্তিও দিয়েছে। অন্যদিকে উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে তার ঘাঁটি স্থাপন করেছেন বলে মিডিয়াতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক ফ্যাটিগ পরিহিত কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ও তার সহযোদ্ধাদের একটি ছবি স্থানীয় একটি সাপ্তাহিকীতে ছাপা হয়েছে। পরেশ বড়ুয়া ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। উল্লেখ্য, উলফার মতো ঊঃযহরপ স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো এভাবেই ভাঙন অভ্যুদয়ের পথ ধরে এগিয়ে চলে।

আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগেই অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তর করা হবে কি-না জানতে চাইলে সাহারা খাতুন বলেন, প্রক্রিয়া শেষ হলেই তাকে ভারতের কাছে ফেরত দেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান শিকদার বলেন, এক দেশ থেকে আরেক দেশে অপরাধী বিনিময়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে অনুপ চেটিয়াকে কোন প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হবে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অনুপ চেটিয়ার শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তার নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা আদালতে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, একজন ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে অনুপ চেটিয়ার জীবন ভারত সরকারের হাতে নিরাপদ নয় বলে মনে করার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে।

গোলাপ বড়ুয়া ওরফে অনুপ চেটিয়াকে ১৯৯৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার আদাবর থেকে গ্রেফতার করা হয়। অনুপ চেটিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগেরই শাসনামলে। এখন তাকে যখন হস্তান্তর করা হচ্ছে, তখনও আওয়ামী লীগের সরকার দেশের শাসনক্ষমতায়। অনুপ চেটিয়ার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে অনেক ধরনের গুজব ঢাকা নগরীর বাতাসে উড়ে বেড়াত। অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং অবৈধ মুদ্রা ও স্যাটেলাইট ফোন রাখার অভিযোগে 'ঋড়ত্বরমহবত্ং ধপঃ ধহফ ঢ়ধংংঢ়ড়ত্ঃ ধপঃ'-এ তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। অবৈধ বিদেশি মুদ্রা রাখার দায়ে অনুপ চেটিয়াকে ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৫ হাজার টাকা জরিমানাসহ ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করে। ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে ফরেনার্স ও পাসপোর্ট আইনে তত্কালীন মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত তাকে ৪ বছরের সশস্ত্র কারাদণ্ড দেন।

২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়। এরপর তিনি জাতিসংঘ বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে চিঠি দেন। উলফার পক্ষ থেকেও অনুরূপ চিঠি দেয়া হয়। অনুপ চেটিয়া বর্তমানে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। তিনি যদি বিপন্নবোধ না করতেন তাহলে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে আশ্রয় চাইতেন না। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে মুক্তিসংগ্রামরত সব জাতি ও জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন করে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এমন অঙ্গীকার যে রাষ্ট্রের, সেই রাষ্ট্র কি অনুপ চেটিয়ার মতো একজন মুক্তিসংগ্রামীকে তার প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিতে পারে? পাঠক ১৯৭১ সালের কথা স্মরণ করুন। সেই সময়ে তাজউদ্দীন আহমদসহ আমাদের অনেক জাতীয় নেতাই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এবং পাকিস্তানি হায়েনাদের থাবা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য। সেই সময় ভারত সরকার যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দোহাই তুলে এদের পাকিস্তান সরকারের হাতে তুলে দিত তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত? অনুপ চেটিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশ বিশাল এক নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি।

mahabub.ullah@yahoo.com
[সূত্রঃ আমার দেশ, ০৬/০৮/১১]

No comments:

Post a Comment