Friday, August 12, 2011

শাসকশ্রেণীর রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির বিপজ্জনক পরিণাম বদরুদ্দীন উমর

পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের জনগণ নিজেদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক ধরনের সংস্কার ও পশ্চাৎপদ চিন্তা পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন। রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাবের নগণ্যতা ও প্রান্তিকীকরণ ছিল এই আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফল। সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে যে ভূমিকা পালন করেছিল তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করে রেখে বাংলাদেশে কোন কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ উদ্ধার করতে নিযুক্ত থাকাই অন্যতম কারণ, যার জন্য যে পশ্চাৎপদতা পাকিস্তানি আমলে জনগণ সংগ্রামের মাধ্যমে পেছনে ফেলেছিলেন বাংলাদেশে সেটাই আবার ফিরে এসেছে। পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা অস্বীকার করে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও ক্ষমতাসীন মতলববাজ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক কৃতিত্ব জাহির করে অন্য সব ধরনের সংগ্রামকে যেভাবে আড়াল করেছিল এবং এখনও পর্যন্ত আড়াল করে রাখে, সেটাই বর্তমানে রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। পাকিস্তানি জমানায় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী যে সেক্যুলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল তার কোন খবরই বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম রাখে না। কোন আলোচনা, কোন পাঠ্যবইয়ে সেই সংগ্রামের নাম-গন্ধ কোথাও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। কাজেই বর্তমান প্রজন্ম যে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হওয়ার কারণেই সামগ্রিকভাবে মানুষের চিন্তাভাবনা পশ্চাৎপদতা উত্তীর্ণ হয়ে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সেক্যুলার হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া যত স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল, অন্য ক্ষেত্রে সেটা তত স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও সেই অভিন্ন প্রক্রিয়া ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জারি ছিল। বাংলাদেশ আমলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় শাসকশ্রেণী ও তাদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিস্ময়করভাবে দ্রুত চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে পরিণত হওয়ায় পশ্চাৎপদ চিন্তা জনগণের মধ্যে আবার ফিরতে শুরু করে। এই পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনার চেহারাই আমরা এখনকার এক ধরনের বিকৃত ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে দেখছি। রাজশক্তির অস্ত্রের জোরের থেকে সুফি ধর্ম প্রচারকদের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার আবেদনেই বাংলাদেশের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা দখলের আগে থেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন। ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালে মুসলমান রাজশক্তি পর্যন্ত অস্ত্রের জোর প্রয়োগ করেনি, সুফি ধর্ম প্রচারকরাও হজরত মুহম্মদ (সাঃ) বা ইসলামের মর্যাদা প্রচার ও রক্ষণের জন্য রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে বের হওয়ার চিন্তাও করেননি। তখনকার সঙ্গে বর্তমানের এটাই বড় পার্থক্য। শুধু শত শত বছর আগের কথাই নয়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, ইসলামের মর্যাদা রক্ষার জন্য পাকিস্তানি আমলেও ধার্মিক মুসলমানরা রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে নামেননি। এখনকার ইসলামী ‘জেহাদিদের’ থেকে তারা ব্যক্তিগতভাবে অনেক ধার্মিক ছিলেন। শুধু নামাজ রোজার ব্যাপারেই নয়, ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও তাদের নৈতিক মান অনেক উচ্চ ছিল। ইসলামের মর্যাদার জন্য কর্তব্য কী, এ বিষয়ে তাদের চিন্তাভাবনাও ছিল এখনকার থেকে অনেক ভিন্ন এবং বলতে অসুবিধে নেই, অনেক উচ্চতর।

এই মুহূর্তে সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো না রাখার জন্য ধর্মীয় দলগুলো লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে যেভাবে সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তার থেকে মনে হয় আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস লাঠির জোরে স্থাপন করার ব্যাপার!! কোন ধর্মের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস যে এভাবে স্থাপন করানো যায় না, এটা বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞান-বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। কাজেই বোঝার অসুবিধে নেই যে, বর্তমানে ইসলামের ‘ইজ্জত রক্ষাকারী’ দল হিসেবে কিছু ধর্মীয় দল এখন জ্ঞান-বুদ্ধির ঘরে তালা ঝুলিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে চারদিকে এক বিশৃংখল পরিস্থিতি তৈরি করছে। মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে তারা নিজেদের এই লাঠি মিছিলে বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে শুক্রবার মসজিদ থেকে মুসল্লিদের বের করে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে ইসলামের শক্তি প্রদর্শনের নাম করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টায় আছে, যার সঙ্গে ইসলামের আল্লাহর বা কোন ধরনের ধর্মীয় ব্যাপারের কোন সম্পর্ক নেই।

সংবিধানে ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো না রাখাকে যারা ইসলামের প্রতি অবমাননা বলে মনে করে এবং এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের ধর্মচর্চা বাধাগ্রস্ত হবে মনে করে, তাদের সঙ্গে জনগণের বাস্তব জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। তা যদি থাকত তাহলে তারা দেশের অনেক মানবিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করত। লাঠিসোটা নিয়ে বের হয়ে অন্য অনেক দাবি তুলে মিছিল করত। দ্রব্যমূল্য বাংলাদেশে এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে এবং দ্রুত এর অবস্থা যেভাবে আরও খারাপ হচ্ছে সেটাই এই মুহূর্তে জনগণের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মানুষের কাজ নেই, কাজ থাকলেও উপযুক্ত মজুরি নেই, জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, এসব বিষয়ে ‘ইসলামের মর্যাদা রক্ষাকারী’ মোল্লাদের কোন চিন্তাভাবনা, উদ্বেগ ও কর্মসূচি নেই! কোন আন্দোলন নেই!! অথচ সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা থাকা না থাকার উল্লেখের চেয়ে এই বাস্তব সমস্যাই জনগণের আসল সমস্যা। দেশের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে সংবিধানের কোন খবর নেই। শুধু যে এতে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয় নিয়ে তারা কিছুই জানেন না তা নয়। এই সংবিধান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে কলংকিত করে একটি ফ্যাসিস্ট দলিলে পরিণত হয়েছে এর কোন খবরও তাদের জানা নেই।

মোল্লারা নিজেদের ইহজাগতিক স্বার্থে আজ ইসলামের মর্যাদা রক্ষার এমনকি আল্লাহর মর্যাদা রক্ষার (!!!) জন্য লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামা এবং সংবাদপত্রে এসবের বড় রকম প্রচার থাকার ফলে রাজনীতিতে এর একটা প্রভাব পড়ছে। সংবিধানে ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের’ কথা না থাকলেও এতে বিসমিল্লাহ রাখা হয়েছে এবং তার চেয়ে বড় কথা এরশাদের আমলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষণা করে যে সংশোধনী সংযোজন করা হয়েছিল, সেটাও অটুট আছে। এসবই হল রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধিরই এক একটি দিক। বাংলাদেশে সমগ্র শাসকশ্রেণী এবং তাদের রাজনৈতিক দলগুলো যতই দেউলিয়াত্বপ্রাপ্ত হচ্ছে ততই সব রকম পশ্চাৎপদ ধারা তারা নতুনভাবে আবার আমদানি করছে। রাজনীতিতে ধর্ম চিন্তাও এ আমদানির একটা অংশ।

পাকিস্তানি আমলে ধর্মীয় রাজনৈতিক চিন্তা, সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনায় ধর্মের প্রভাব মোকাবেলা যেভাবে করা হতো তাতে সাধারণভাবে প্রগতিশীলতার শক্তি বৃদ্ধি হতো ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনার প্রভাব কমে আসত। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে তথাকথিত সেক্যুলারপন্থী ও প্রগতিশীলদের আচরণ একেবারে ভিন্ন। এরা যতই ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, কাজ করছেন, ততই তার প্রভাব হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে!! এর থেকেই বোঝা যায়, যেভাবে এ কাজ করা হচ্ছে তার মধ্যে গুরুতর ভ্রান্তি আছে অথবা এ কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে এগিয়ে নেয়ার চক্রান্তেরই অংশ। এ কাজ করা হয়ে থাকে দেশে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্তি বৃদ্ধি করে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তা প্রতিহত করার দুষ্ট উদ্দেশ্যে। যাতে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলরা, ধর্ম ব্যবসায়ীরা আরও শক্তি সঞ্চয় করে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নামতে পারে এজন্য ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক উগ্র কথাবার্তা এমনভাবে বলা হয় যার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চাৎপদ ধর্মীয় শক্তি খর্ব না হয়ে আরও জোরদার হয়। এ রকম ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটতে দেখা যায় যার এক দৃষ্টান্ত দুই-একদিন আগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার একটি স্কুলের এক ঘটনা।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় একটি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক তার ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে হজরত মুহাম্মদকে (সাঃ) ছাগলের সঙ্গে তুলনা করে!!! এর মধ্যে এই হারামজাদার ঔদ্ধত্যের পরিচয় তো আছেই, তাছাড়া এটা মনে করার কারণ নেই যে, এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ধরনের কাজ করা হয়, যাতে ধর্মীয় উম্নাদনা দেশে আরও বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। টুঙ্গিপাড়ায় এ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশের অন্যত্রও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যারা নিজেদের সেক্যুলার বলে দাবি করে তারা এবং যারা ধর্মীয় রাজনীতির চর্চা করে তারা, উভয়েই যেভাবে ধর্মের ব্যবহার করে তাতে দেশজুড়ে পশ্চাৎপদতার পুনরুজ্জীবন হচ্ছে এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়ছে ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতির চরিত্র বিপজ্জনক, কারণ এভাবে পশ্চাৎপদতার শক্তি বৃদ্ধি, রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি দেশের জনগণের সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রেই যে শুধু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে তাই নয়; এ পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রেও মারাত্মকভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ১৭/০৭/১১]

No comments:

Post a Comment