Friday, August 12, 2011

হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবসে বদরুদ্দীন উমর

জার্মানির মতো দেশ যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে দেশকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ নতুন করে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ কীভাবে গ্রহণ করতে পারে? সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য সরকারের সুবুদ্ধির ওপর নির্ভর না করে জনগণকেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। এই আন্দোলন যদি না করা যায় এবং পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন যদি রোধ না করা যায় তাহলে জনগণ অদূর ভবিষ্যতে যে বিপদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তার ভয়াবহতা নিঃসন্দেহে মহাআতঙ্কের ব্যাপার।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় ও নাগাসাকিতে ৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এই দুই আণবিক হামলায় জাপানের লাখ লাখ মানুষের আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং আরও লাখ লাখ মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়, যার মধ্যে অগণিতজনের মৃত্যু হয় এবং বাকিরা সারা জীবন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায় জীবনযাপন করেন। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে চির জীবনের জন্য শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন। দু'দিনের সেই আণবিক বোমা বিস্ফোরণের অভিজ্ঞতা জাপানের জনগণের জীবনে এমন গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এখনও সেই প্রভাব বিস্তার করে আছে যাতে পরমাণু বোমা তৈরির বিরুদ্ধে জাপান সবসময়ই নিজের দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

যুদ্ধের প্রয়োজনে জাপানে ওইভাবে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে লাখ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণহানির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন ছিল না। কারণ ওই বছরই মে মাসে জার্মানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। জাপানও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে আত্মসমর্থনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার আত্মসমর্থন ছিল অল্প দিনের ব্যাপার। সে অবস্থায় আণবিক বোমা আক্রমণের মতো ধ্বংসযজ্ঞ ছিল যুদ্ধের দিক থেকে সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজনীয়। কিন্তু যুদ্ধের দিক থেকে নিষ্প্রয়োজনীয় হলেও এই বোমা নিক্ষেপের প্রয়োজন ছিল অন্য দুই কারণে। এর একটি ছিল জাপান পাল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটির ওপর অতর্কিত বিমান হামলা চালিয়ে যেভাবে সে ঘাঁটি বিধ্বস্ত করেছিল তার প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু আমেরিকার পক্ষে অতীতের এই হিসাব মেটানোর থেকে অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল ভবিষ্যতে যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তির সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সতর্ক করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে আমেরিকা তাদের মোকাবেলার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করেছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমেরিকার নতুন অর্জিত শক্তি প্রদর্শন করে স্টালিনকে হুমকি দেওয়ার জন্যই এই বোমা হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এই দ্বিবিধ কারণে জাপানের ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপের নির্দেশ দিয়ে যুদ্ধাপরাধ করেছিলেন, তার থেকে বড় যুদ্ধাপরাধ আজ পর্যন্ত কোথাও কেউ করেনি। ঠাণ্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ করে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান হয়েছিলেন লাখ লাখ মানুষের হত্যাকারী। কিন্তু মানব ইতিহাসের সব থেকে বড় ক্রিমিনাল হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো শাস্তি হয়নি! তারপরও মার্কিন মানবিক বোধ ও গণতন্ত্রের এমনই মহিমা যে, ১৯৪৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন!

জাপানিরা ১৯৪৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতি বছরই হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবস পালনের সময় আণবিক বোমার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি রাখার সংকল্প এবং আণবিক বোমার হুমকিমুক্ত বিশ্ব গঠনের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন। জাপানে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের লোক এবং জনগণ এ বছরও তাই করছেন। কিন্তু তাদের সামনে এখন এক নতুন বিপদ বড় আকারে ও মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছে। এ বছর ১১ মার্চ এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও তারপর ভয়াবহ সুনামির আঘাতে তাদের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাংচুর হয়ে ভূমি, পানি ও বাতাসে পারমাণবিক তরঙ্গ সঞ্চারিত (জধফরধঃরড়হ) হয়ে পরিবেশ ও জীবনের জন্য যেভাবে হুমকি সৃষ্টি করেছে এটা ১৯৮৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে চেরনোবিলের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর আর দেখা যায়নি। ১৯৪৫ সালের পর এই দ্বিতীয়বার জাপান এমন এক পারমাণবিক বিপদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে যার ধ্বংসের সম্ভাবনা আণবিক বোমা বিস্ফোরণের ক্ষতির থেকেও বেশি হতে পারে যদি এ ধরনের অন্য পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতেও দুর্ঘটনা ঘটে। ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর পার্শ্ববর্তী এলাকার লাখ লাখ লোককে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

জাপানের এই পরমাণু দুর্ঘটনার পর জগৎজুড়ে এখন জ্বালানি হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে। শুধু জনগণই নয়, বিভিন্ন দেশের সরকারও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। এদিক দিয়ে জার্মানি সব থেকে এগিয়ে আছে। জার্মানিতে আগে থেকেই পরিবেশের শুদ্ধতা ও ভারসাম্য রাখার এক শক্তিশালী আন্দোলন আছে। গ্রিন পার্টি নামে তাদের এক রাজনৈতিক পার্টি পরিবেশ বিষয়ে এই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে। এখন জাপানের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর জার্মানিতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে শুধু জনগণ নয়, সরকারও অবস্থান গ্রহণ করেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেল কিছুদিন আগেও বলেছিলেন য, জার্মানি তার পারমাণবিক শক্তি আরও বড় আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করবে। কিন্তু এখন তিনিই জাপানের দুর্ঘটনার পর পুরনো পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, ২০২২ সালের মধ্যে জার্মানি পারমাণবিক শক্তির ব্যাপার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করবে।

শুধু জার্মানিই নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং ইউরোপের বাইরেও পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বন্ধ করার চিন্তাভাবনা সক্রিয়ভাবে শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বিষয়ে নানা মহলে বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। এতদিন ধরে তেল-গ্যাস বাদ দিয়ে পারমাণবিক শক্তি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত অনেক দেশ গ্রহণ করেছিল এবং সেই হিসাব অনুযায়ী তারা নতুন পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল সেগুলো বন্ধ রাখার চিন্তা এখন বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে। বিশেষত জনগণের মধ্যে এর বিরোধিতা ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব দেশ ইতিমধ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মধ্যে যায়নি, কিন্তু যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছিল তারা তাদের সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে। কারণ একদিনে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড বিশ্বের আবহাওয়া উত্তপ্ত করে যে বিপর্যয় ডেকে আনছে, তার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে দুর্ঘটনা যুক্ত হলে মানব জাতির অস্তিত্ব প্রবলভাবে হুমকির সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত জ্বালানির জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না। কিন্তু এ নিয়ে সরকারি মহলে অনেক দিন থেকেই চিন্তাভাবনা ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হয়েছে। পাকিস্তান আমলে ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের যে পরিকল্পনা ছিল তা পাকিস্তান আমলেই প্রায় বাতিল হয়েছিল। বাংলাদেশ আমলে বিভিন্ন সরকার নতুনভাবে পরিকল্পনা কার্যকর করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি বর্তমান সরকার রূপপুরে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে কয়েকদিন আগে, জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর! যেখানে ইতিমধ্যেই পারমাণবিক শক্তি জ্বালানির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানে তা বন্ধ করা এবং নতুন কোনো কেন্দ্র স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র না থাকা সত্ত্বেও নতুন করে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে! তার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে!

এই অবস্থা দেখে মনে হয়, অন্য অনেক ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনা ও পরিণতি বিবেচনা না করে যেভাবে সরকার বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা কার্যকর করছে, এক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রের সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের পার্থক্য এই যে, এর মতো ধ্বংসাত্মক সম্ভাবনা অন্য কিছুর মধ্যে নেই। অন্যান্য অগ্রসর দেশ, জাপানের মতো, জার্মানির মতো দেশ যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে দেশকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ নতুন করে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ কীভাবে গ্রহণ করতে পারে? এর মধ্যে কোন সুবুদ্ধি, সুযুক্তি বা সুবিবেচনা কাজ করতে পারে?

কিন্তু সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য সরকারের সুবুদ্ধির ওপর নির্ভর না করে জনগণকেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। এই আন্দোলন যদি না করা যায় এবং পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন যদি রোধ না করা যায় তাহলে বাংলাদেশের জনগণ অদূর ভবিষ্যতে যে বিপদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তার ভয়াবহতা নিঃসন্দেহে এক মহাআতঙ্কের ব্যাপার।
[সূত্রঃ সমকাল, ০৯/০৮/১১]

No comments:

Post a Comment