আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশই ভঙ্গ করছে আইন। তারা একের পর এক ঘটাচ্ছে বিতর্কিত ঘটনা। বেড়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সহায়তা, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া, মাদক ব্যবসায় মদদ দেওয়া, থানায় বন্দির ওপর নির্যাতন, গুম, গণপিটুনিতে সহায়তা করাসহ নানা অভিযোগ। তাদের আচরণে বিব্রত সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহল। গুটিকয়েক পুলিশ সদস্যের আচরণ জন্ম দিচ্ছে হাজারো প্রশ্ন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে। আর তাই সরকারের এখন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের বেকায়দায় ফেলার কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কি না! এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার পুলিশের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে থলের বেড়াল।
বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু পুলিশ নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করায় পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। বর্তমান সরকার এ থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পুলিশ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, 'দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণমাধ্যমে যাদের নাম আসছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুরু পাপে লঘু নয়, গুরু পাপে গুরুদণ্ডই দেওয়া হবে।' গত বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোক দিবস উপলক্ষে ওলামা লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি সাভারের আমিনবাজারে গণপিটুনিতে ছয় ছাত্র হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরের ওপর পুলিশি নির্যাতন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে তরুণ মিলনকে গণপিটুনিতে হত্যা, রাজধানীর দয়াগঞ্জ থেকে তিন তরুণকে ডিবি পরিচয়ে অপহরণের পর হত্যা, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার নওগাঁর ধামইরহাটে পুলিশের লাথিতে এক বৃদ্ধার মৃত্যুসহ কয়েকটি ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনারই বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া দরকার। দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বেড়েছে ন্যক্কারজনক আচরণ : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ জুলাই খিলগাঁও থানার সিভিল টিমের এসআই আলম বাদশা ও এএসআই শাহিনুর রহমান সেগুনবাগিচা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। অভিযোগ উঠেছে, থানায় তাঁকে ডাকাতি মামলার আসামি সাজিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে চালানো ওই নির্যাতনে হাত-পা থেঁতলে যায় কাদেরের। তাঁর পায়ে চাপাতি দিয়ে আঘাত করেন স্বয়ং থানার ওসি। আহত অবস্থায়ই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে আবদুল কাদেরকে আদালতে হাজির করেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে আদালত খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিন, সিভিল টিমের কর্মকর্তা এসআই আলম বাদশা ও এএসআই শাহিনুর রহমানকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন।
কাদেরের ঘটনার মতো দেশব্যাপী তোলপাড় হয়েছে গত ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের আরেকটি ঘটনায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এইচএসসি পরীক্ষার্থী লিমনকে র্যাব-৮-এর একটি দল আটক করে বাম পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় লিমনের একটি পা কেটে ফেলতে হয়। গত ১৮ জুলাই সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নিহত ছয় ছাত্রের বেঁচে যাওয়া সঙ্গী আল-আমিনের ভাষ্য, ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিল। এই ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকাকে কেন অবৈধ ও বে-আইনি ঘোষণা করা হবে না, তা সরকারের কাছে জানতে চান হাইকোর্ট। আরো অভিযোগ রয়েছে, বড়দেশীতে পুলিশকে ম্যানেজ করেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে মাদক ব্যবসা।
সাভারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নিরপরাধ কিশোর সামছুদ্দিন মিলনকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, খালাতো বোনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে মিলনকে এলাকার কয়েকজন ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এরপর পুলিশ তাঁকে ডাকাত আখ্যায়িত করে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছেড়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে। একটি টেলিভিশন চ্যানেল এ ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করলে হৈচৈ পড়ে যায়। এ ঘটনায় ৬ আগস্ট এসআই আক্রাম উদ্দিন শেখ, কনস্টেবল হেমরঞ্জন চাকমা ও আবদুর রহিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ৮ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. রফিক উল্লাহকে ক্লোজ করা হয়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক জরিপ থেকে জানা যায়, গত আড়াই বছরে দেশে গণপিটুনিতে ৩৬৩ জন নিহত হয়েছে। গত সাত মাসে ৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। ডাকাতি সন্দেহে বেশির ভাগ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রহস্যজনক গুম-হত্যায় বিব্রত প্রশাসন : গত ৩১ জুলাই রাজধানীর দয়াগঞ্জ থেকে স্থানীয় তরুণ জুয়েল, রাজীব ও ওয়ার্কশপকর্মী মিজানুর হোসেনকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় কয়েকজন সাদা পোশাকের লোক। ৫ আগস্ট এই তিনজনের মধ্যে দুজনের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরে এবং আরেকজনের ঢাকা-মাওয়া সড়কের পাশে। এ ঘটনার কোনো দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি ডিবি পুলিশ।
গত আড়াই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে এমন বেশ কিছু অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কোনো তদন্তপ্রক্রিয়াই সঠিকভাবে এগোয় না। গত বছরের ১৭ এপ্রিল বাড্ডার কুড়িল থেকে র্যাব পরিচয়ধারীরা ঝালকাঠির রাজাপুরের মিজানুর রহমান মিজান, নাজমুল হক মুরাদ ও ফোরকানকে অপহরণ করে। ২৭ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের পেছনে তুরাগ চরে ওই তিনজনের লাশ পাওয়া যায়। ১৮ এপ্রিল গাজীপুর থেকে পুলিশ নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী নূরুল আমিন মাকসুদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। গত বছর কারওয়ান বাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাইদুলকে হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। বিএনপির নেতা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে গত বছরের ২৫ জুন রাতে ফার্মগেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে অভিযোগ করে তাঁর পরিবার। এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। রাজধানী থেকে নিখোঁজ হয় সাবেক যুবলীগ নেতা এবং তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত হোসেন। তার স্ত্রী দাবি করেন, লিয়াকতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দাবি অস্বীকার করে র্যাব ও পুলিশ। যেটাই ঘটুক, লিয়াকত এখন পর্যন্ত নিখোঁজ। গত বছর ফার্মগেট এলাকা থেকে সুজন নামের এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করে তাঁর পরিবার। ঘটনা অস্বীকার করেছে পুলিশ। সুজন নিখোঁজ আছেন এক বছর।
সমালোচনায় বেপরোয়া আচরণ : গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার রজনীগন্ধা মার্কেটের স্বর্ণালী জুয়েলার্সে কথিত চুরির অভিযোগে নিঙ্ন নামের এক দোকান কর্মচারীকে গ্রেপ্তারের পর অমানুষিক নির্যাতন করে কাফরুল থানা পুলিশ। নিঙ্ন এখন জামিনে মুক্ত হলেও পঙ্গুপ্রায়। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে অভিযুক্ত এসআই কামরুল ইসলামকে 'মৃদু শাস্তি' হিসেবে দারুস সালাম থানায় বদলি করা হয়। সবই ঘটেছে যে ওসির নির্দেশে তিনি বহালতবিয়তে আছেন। কেউ কেউ বলছে, ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার জন্য মালিক ৭৫ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি গেছে উল্লেখ করে একটি মিথ্যা মামলা করেছেন। মালিকের ঘনিষ্ঠজন স্থানীয় একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
গত ৬ জুলাই হরতাল চলাকালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়। এরপর আলোচনার শীর্ষে পেঁৗছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। ঘটনাটিতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, একসময়ের ছাত্রলীগ ক্যাডার হারুন পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে নয়, তাঁর রাজনৈতিক গুরুদের ইশারাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের ওপর। এতে সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ প্রশাসন ও সরকার।
জানা গেছে, গত বছর ১৪ নভেম্বর ফার্মগেট খামারবাড়ী পুলিশ বঙ্রে কাছে দৈনিক কালের কণ্ঠের ক্রীড়া প্রতিবেদক সামীউর রহমানকে পিটিয়ে জখম করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসান দায়িত্বরত সার্জেন্ট রাশেদুল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। ওই সময় খামারবাড়ী এলাকায়ই এক মাসের ব্যবধানে আরো তিন সাংবাদিককে নির্যাতন করে পুলিশ। এসব ঘটনায় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে পুলিশের। অথচ আজ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সমালোচনার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার উমার ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে মাদকবিরোধী এক অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশের লাথিতে আমেনা বেওয়া (৮৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়। গ্রামবাসী ধামইরহাট থানার এসআই মোহসীন আলীকে আটক করে। পুলিশের অন্য সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করতে সাতটি ফাঁকা গুলি ও দুটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে নওগাঁর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আহমারুজ্জামান জানিয়েছেন, পুলিশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে বৃদ্ধা মারা যান।
গত বছরও এমন পরিস্থিতি হয় : মাঠপর্যায়ে র্যাব ও পুলিশের আচরণ বারবার বেকায়দায় ফেলছে প্রশাসন ও সরকারকে। গত বছরের মাঝামাঝিতে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনজনের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় চরম বিপাকে পড়ে প্রশাসন, সরকার।
গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ হেফাজতে মারা যায় রিকশাচালক মানিক। ২৯ জুন অটোরিকশাচালক বাবুল গাজীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে রমনা থানার এসআই আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে। ৩১ জুন গুলশানে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ২ জুলাই গাবতলী-আমিনবাজার সেতুর পাশ থেকে উদ্ধার হয় মজিবুর রহমান নামের এক পরিবহন শ্রমিকের লাশ। অভিযোগ ওঠে, দারুস সালাম থানার তিন দারোগা হেকমত, মশিউর ও সায়েম ৫০ হাজার টাকা চাঁদার দাবিতে পিটিয়ে ও চুবিয়ে হত্যা করে মজিবুরকে। এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অফিসাররা কয়েক দিনের মাথায় চাকরিতে আবার বহাল হন। মজিবুরের মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত এসআই হেকমত পল্লবী থানায় কর্মরত। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ_তিন শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় তিন নারী-পুরুষকে থানায় দুই দিন আটকে নির্যাতন করার।
বিশ্লেষকরা যা বলেন : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, 'যে পুলিশ প্রশাসন দেবে জনগণকে নিরাপত্তা, সেই তাদের দ্বারা একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা কারোরই কাম্য নয়। এসব ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অতীতে এ ধরনের ঘটনায় বিচার না হওয়ার কারণে আইন ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে।' ড. মিজানুর রহমান আরো বলেন, একের পর এক পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আলামতও হতে পারে। পুলিশের সব সদস্যই সরকারের মঙ্গল চান_এমনটি নাও হতে পারে। অতীতে অনেক পুলিশকে দেখেছি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। আর তাই এখন যেসব ঘটে চলেছে তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল হাকিম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাদের দেশের মানুষের পুলিশ সম্পর্কে ধারণা সব সময়ই নেতিবাচক। তারা এখন পর্যন্ত এমন কিছু করতে পারেনি যে জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখবে। পুলিশের দ্বারা লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও আইন ভাঙার ঘটনা ঘটলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখলেই তা বোঝা যায়। পুলিশে রাজনীতিকরণ এর একটি বড় কারণ। গায়ে ইউনিফর্ম ও হাতে অস্ত্র পেয়েই নিজেকে তারা ক্ষমতাধর মনে করে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনেও সংস্কার প্রয়োজন।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পুলিশকেই তাদের কাজের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহ্য আর ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হবে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা নিতান্তই দুঃখজনক। পুলিশ প্রবিধান হোক, মানবাধিকার আইন হোক আর দেশের সংবিধানই হোক, সবখানেই বন্দিকে মারধর করা যাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। পুলিশ কোনো ক্ষমতাবলেই একজনকে তার হেফাজতে নিয়ে মারধর করতে পারে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং পুলিশের সাবেক আইজি এ এস এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ষড়যন্ত্র, বিরোধ যাই থাকুক না কেন নিজেদের ভেতরের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে আগে। বিভাগীয় পর্যায়ে চেইন অব কমান্ড এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাঁদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নিলে বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।'
পুলিশের আইজি খন্দকার হাসান মাহমুদ বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, অপরাধ অপরাধই। পুলিশকে তদন্তের মাধ্যমে এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। মারধর করে তথ্য আদায়ের কখনোই আইনসম্মত নয়। বিচ্ছিন্ন যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সেটা কেউই কামনা করে না। সংশ্লিষ্ট (অভিযুক্ত) পুলিশদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, এর পেছনে সরকার বা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য কোনো মহলের চক্রান্ত আছে কি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বদলি, পদোন্নতি, চাকরিচ্যুতি, কথিত ভালো স্থানে পদায়ন_সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিকভাবে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাগজে স্বাক্ষর করেন মাত্র। এটা শুধু বর্তমান সরকারের বেলায় প্রযোজ্য নয়, অতীতের সব সরকারের বেলাতেও ছিল। পুলিশ বিভাগে যাঁদের বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির কাছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির কাছে, তাঁরা দাপট দেখাতে ওস্তাদ। তাঁরা তোয়াক্কা করেন না সিনিয়র কাউকে। আর এই গোষ্ঠীভুক্তদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বা উলি্লখিত মন্ত্রীদের পরিচয় বা কোনো সাপোর্ট থাক বা না থাক, তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই এলাকার লোক হওয়ার কারণেই অনেকটা সমীহ করে চলেন। ভাবখানা এমন যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকার বা প্রধানমন্ত্রীর এলাকার লোক। অতএব তাঁর কথা না রাখলে বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাখোশ হয়ে উল্টো তাঁরই ক্ষতি করতে পারেন। ব্যবস্থা না নিয়ে বরং সহায়তা করলে মন্ত্রী মহোদয়রা আরো খুশি হতে পারেন। দেশে এ রকম মনোভাবাপন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি। আর এসবের কারণে যেটা হয়, সেটা হচ্ছে পুলিশে চেইন অব কমান্ড বলে কিছুই থাকে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে ভালো কিছুই ঘটবে না। ভালো কিছু আশা করাটাও হবে বোকার স্বর্গে বাস করা।
No comments:
Post a Comment