শাসক শ্রেণীর প্রধান দলগুলোর অবস্থা দেখে মনে হয়, নির্বাচন সমস্যা ছাড়া এদের চিন্তা-ভাবনায় আর কিছুই নেই যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জনগণের কাছে নির্বাচন কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয়, বিশেষ করে পরবর্তী নির্বাচন যখন এখনও অনেক দূরে, আড়াই বছর পর। এদের রাজনীতিতে নির্বাচন যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এটা ঠিক। এ নিয়ে এদের দোষারোপ করারও কিছু নেই। কিন্তু নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং নির্বাচনকে রাজনৈতিক কর্মসূচিসর্বস্ব মনে করা ভিন্ন ব্যাপার। এ দ্বিতীয় ব্যাপারটি এখানে হচ্ছে। এটা যে সমগ্র শাসক শ্রেণীর শ্রেণীগত অবস্থানের শোচনীয় দেউলিয়াপনারই প্রমাণ এতে সন্দেহ নেই।
নির্বাচনই যেহেতু এই রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এ কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের রাজনৈতিক কলাকৌশল ও দুর্নীতির অন্ত নেই। সংবিধান সংশোধন থেকে নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠনের তৎপরতা পর্যন্ত সবকিছুই এখন একই সূত্রে গাঁথা। নির্বাচনই এসবের কেন্দ্রীয় বিষয়।
রাজনৈতিকভাবে নির্বাচন ও নির্বাচিত জাতীয় সংসদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে, এমন বলার উপায় নেই। নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন যে কোন সময়েই কারচুপিহীন থাকেনি, এ অভিজ্ঞতা সব সময়েই হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আশির দশকে এরশাদের সামরিক সরকার উচ্ছেদ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তৎকালীন বাংলাদেশের বিশেষ অবস্থায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব হলেও এভাবে নির্বাচিত প্রথম সরকারের মেয়াদ শেষে দেখা যায়, এর প্রয়োজন শেষ হয়নি। ক্ষমতাসীন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনবিরোধীদের দ্বারা অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ সংশোধনী মোতাবেক ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে পর পর তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে সরকার গঠিত হয়। দেখা যায়, এই তিন নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়ে বিরোধী দল ক্ষমতায় আসে। এর থেকে প্রমাণিত হয়, যে দলকে ভোটাররা নির্বাচিত করেন, তারা ক্ষমতায় বসে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে তার খেলাপ কাজ করে এমন অজনপ্রিয় হয়, যাতে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা তাদের আর সরকারে বসান না।
এভাবে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় এদিকে খেয়াল রেখে নির্বাচন কমিশনকে সরকারদলীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন করার প্রবণতা এ দলগুলোর পক্ষে স্বাভাবিক। এ প্রবণতার বশবর্তী হয়েই আওয়ামী লীগ সরকার এমন এক সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে বিদ্যমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। নির্বাচিত বিদ্যমান সরকারের অধীনে নির্বাচন গণতন্ত্রসম্মত এবং দুনিয়ার সব দেশে এটা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও আগে তাই হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন বিদ্যমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা সম্ভবত না থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হল, একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। আসলে ১৯৯০ সালের পর থেকে নির্বাচন কমিশনকে বিদ্যমান সরকার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকায় অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী সরকারি হস্তক্ষেপে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অকেজো হওয়ার ষোলআনা সম্ভাবনার জন্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্য সংসদীয় দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারই চেয়েছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিএনপিকে বাধ্য করেছিল। নিজেদের সরকারি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন করে তারা সরকার গঠন করলেও আওয়ামী লীগ সে নির্বাচন বয়কট করায় নির্বাচন কারও জন্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারকে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তার অধীনে নির্বাচন করতে হয়। ১৯৯৬ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং তার থেকে বোঝার কোন অসুবিধা ছিল না যে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ক্ষমতায় ফেরত আসা সম্ভব ছিল না। পরাজয় নিশ্চিত জেনে কারচুপির মাধ্যমেই ১৯৯৬ সালের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে নিজেদের সরকারের অধীনেই নির্বাচন করেছিল।
দেখা যায়, ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভের কোন ক্ষমতাই এ দলগুলোর নেই। হতে পারে, ক্ষমতার নেশায় অন্ধ এবং উন্মাদ হয়ে এরা ইতিহাসের দিকে তাকানো অথবা নিজেদের অভিজ্ঞতার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে অক্ষম থাকে। এটা শুধু অন্ধত্ব এবং উন্মাদগ্রস্ততারই পরিচায়ক নয়, এর আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এদের গণতান্ত্রিক চরিত্রহীনতা ও দেউলিয়াপনা। যাই হোক, এ সবেরই বশবর্তী হয়ে এরা যেসব কাজ করে তার মধ্যে যুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বুদ্ধি-বিবেচনার দেখা পাওয়া যায় না।
জাতীয় সংসদের পরবর্র্তী নির্বাচন এখনও আড়াই বছর দূরে থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করেছে এবং তাদের সর্বস্তরের নেতৃত্ব থেকে এখন প্রায় প্রতিদিনই বলা হচ্ছে যে, আগামী নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই হবে। ‘নির্বাচিত সরকারের অধীনে’ নির্বাচন হবে এ কথা বলে, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে এরা যতই গণতন্ত্রী সাজার চেষ্টা করুন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল যে তাদের গণতন্ত্র পূজার কারণেই হয়েছে এটা দেশের একজন লোকও বিশ্বাস করে না এবং যারা উচ্চকণ্ঠে এর পক্ষে প্রচার চালান তারা নিজেরাও বিশ্বাস করেন না। তারা বিলক্ষণ জানেন, কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা গণতন্ত্রী সেজে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলে চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছেন। আসল কথা হল, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর চরম অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণেই অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন থেকে বেশি গণতান্ত্রিক! এটাই বাংলাদেশের বর্তমান বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর রাজনীতির এক গুরুতর স্ববিরোধিতা। এই স্ববিরোধিতার প্রতিফলনই আমরা দেখছি প্রধান দুই দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্কের মধ্যে।
আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে যেমন গণতন্ত্র পূজার কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি, তেমনি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি করেও তাদের গণতন্ত্র পূজার কোন পরিচয় প্রদান করছে না। কারণ এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীত অবস্থানের লক্ষ্য অভিন্ন। এই লক্ষ্য হল, আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করা। এর জন্য প্রয়োজন হলে গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক যে কোন উপায়ই হল তাদের জন্য হালাল!
বাংলাদেশে সব কাজ ফেলে দিয়ে, সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যার প্রতি প্রকৃতপক্ষে উদাসীন থেকে, শাসক শ্রেণীর দলগুলো যেভাবে নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি করছে এর মাধ্যমে তাদের উভয় পক্ষেরই অগণতান্ত্রিক চরিত্রের স্বাক্ষর তারা রাখছে।
এ বিষয় নিয়ে অধিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। তবে এটা এখানে স্পষ্টভাবেই বলা দরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে বিদ্যমান ক্ষমতাসীন সরকার যদি পরবর্তী নির্বাচন করে তাহলে এদের অবস্থা হবে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচনের মতো। কারণ সেই নির্বাচন কারও দ্বারা গ্রহণযোগ্য হবে না। এই অবস্থায় নির্বাচনের পর যদি সরকার টিকে থাকে, তাহলে তাকে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের মতোই সংবিধান সংশোধন করে তাদের আর একটি নির্বাচন করতে হবে। ১৯৯৬ সালে সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আওয়ামী লীগ সরকারকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত আনতে হবে। রাজনীতির সঙ্গে যাদেরই সামান্য সম্পর্ক আছে, যারা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু খবর রাখেন তাদের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্ছেদ করে ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকারের’ মাধ্যমে নির্বাচনের এই পরিণতি বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এসবের কোন তোয়াক্কা না করে এ দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ যে পথ ধরেছে তার থেকে এদের নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা এবং বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতির অকার্যকারিতাই বিশেষভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ৩১/০৭/১১]
No comments:
Post a Comment