Friday, August 12, 2011

বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা বদরুদ্দীন উমর

রাজনৈতিক এবং অন্য কিছু বিষয়ে ইংরেজি দৈনিক Daily Star যে ভূমিকাই পালন করুক, পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশের ওপর সব রকম হামলার বিরুদ্ধে পত্রিকাটি এমন এক জিহাদ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে যা অন্য কোনো জাতীয় পত্রিকায় দেখা যায় না। বনাঞ্চলে গাছ ও জীবজন্তু, পশুপাখি, সরীসৃপ থেকে নিয়ে পাহাড়, জলাশয় সবকিছু এখন দেশজুড়ে যেভাবে চোর-ডাকাত-দুর্নীতিবাজদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হচ্ছে তার বিরুদ্ধে তারা নিয়মিতভাবে বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট প্রকাশ করে বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অবদান রাখছে এই অর্থে যে, দেশের জনগণকে তারা সতর্ক করছে, এই অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে সেটা দেশ ও জনগণকে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে। এ প্রসঙ্গে এখানে এটা প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে, এই পত্রিকাটিসহ পরিবেশ রক্ষার জন্য আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয় নিয়ে সরকারের কাছে অনেক দাবি ও প্রস্তাব পেশ করলেও সরকার মুখে যাই বলুক, কার্যক্ষেত্রে তার বিপরীত কাজ করে লুণ্ঠনজীবী পরিবেশ ধ্বংসকারীদের নানাভাবে প্রশ্রয় ও আশ্রয় দিয়ে লুণ্ঠন কাজে তাদের সহায়তাই করে যাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিজেরাই নিয়মিতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি ও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে!! বন বিভাগ, আইডব্লিউটিএ, রাজউক, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ইত্যাদি সরকারি বিভাগ, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে এর রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়। ৮ আগস্ট ২০১১ তারিখের Daily Star-এর প্রথম পৃষ্ঠায় এক সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, কীভাবে কামরাঙ্গীরচরের কাছে বুড়িগঙ্গার ওপর র্যাব-১০ তার স্থায়ী অফিস ও স্টাফ কোয়ার্টারের কতগুলো ভবন তৈরির জন্য নদী ভরাট করছে। এর আগে ২০১১ সালের ১৫ মে তারা ‘বুড়িগঙ্গার ওপর র্যাব অফিস’ নামে একটি সচিত্র রিপোর্ট ছেপেছিল, কিন্তু তাতে কোনো কাজ যে হয়নি তার প্রমাণ র্যাবের উপরোক্ত প্রকল্পের কাজ এখন পুরোদমে এগিয়ে চলেছে!

একদিকে এই অবস্থা এবং অন্যদিকে যমুনা থেকে বুড়িগঙ্গায় পরিষ্কার পানি এনে ফেলার এক বিরাট ব্যয়বহুল প্রকল্প কার্যকর করার ঘোষণা এখন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে ৯৪৫ কোটি টাকা। (Daily Star, 8-8-2011) এই প্রকল্প অনুযায়ী যমুনাকে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে তুরাগ-বংশী-পুংলী নদী ও তারপর ধলেশ্বরীর মধ্য দিয়ে। এই উদ্দেশ্যে গত মাসে প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ পরিচালিত হবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্বারা। একাধিক পর্যায়ে এই সংস্থাটি বিভিন্ন নদী ও খালে ১৬২.৫ কিলোমিটার ড্রেজিং করবে। ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’ (Buriganga River Restoretion) নামে এই প্রকল্পের কাজ ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এর কাজ শুরু হতে এক বছর দেরি হওয়ায় তা শেষ হতেও কিছু বিলম্ব হবে।

আপাতদৃষ্টিতে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারের এই কর্মসূচি বড়ই আশা ও সুখের ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশের শাসন পরিচালনার ভার যাদের হাতে তারা এই প্রকল্পের কী পরিণতি ঘটাবে সে বিষয়ে ঘোর সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে। একথা বলার কারণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ পর্যন্ত যা দেখা গেছে তাতে সরকারের কাজ ও কথার মধ্যে যেমন কোনো মিল নেই, তেমনি এদের কোনো কাজের শুরু ও শেষের মধ্যে হাজার রকম গর্ত। এসব গর্তে পড়ে অনেক প্রকল্পেরই সমাধি হয়, কিন্তু প্রকল্পের সমাধি হলেও চুরি-দুর্নীতির মাধ্যমে এসব প্রকল্পের টাকা সংশ্লিষ্ট লোকদের পকেটে প্রবেশ করে। এই লুটপাটে ক্ষমতাসীন সরকারের লোক, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ঠিকাদার থেকে নিয়ে সম্পর্কিত সব রকম লোকই ভাগ বসায়। কাজেই ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার’ প্রকল্প ঘোষণা, এর জন্য টাকা বরাদ্দ ও এর কাজ শুরু হলেও এর পরিণতি কী হবে সে নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছুই নেই।

একথা বলার বিশেষ কারণ এই যে, বাংলাদেশে এখন লুটপাটের সব থেকে বড় ক্ষেত্র হলো জমি। এই জমি লুটপাটের সঙ্গে সম্পর্কিত হলো, নদীর পানি মেরে জমি তৈরি। এভাবেই বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি ছোটবড় নদী, লেক, খাল-বিলসহ সব ধরনের জলাশয় এখন ভূমিদস্যুদের দ্বারা এমনভাবে দখল হয়ে চলেছে যাতে শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, এসব জলাশয় পুনরুদ্ধারও দেশের পরিবেশ ও জনগণকে রক্ষার জন্য আবশ্যক। প্রথমত বলা দরকার যে, নদী পুনরুদ্ধার বলতে শুধু নদীর দূষিত পানি শোধন বা দূষিত পানির সঙ্গে কিছু পরিষ্কার পানি যোগ করে দূষণ কমিয়ে আনা নয়। নদী পুনরুদ্ধারের অর্থ নদীকে মেরে জমি তৈরির যে তাণ্ডব অবাধে দেশজুড়ে চলছে, এমনকি সরকারের নাকের ডগায় ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতে চলছে, তা এই মুহূর্তে বন্ধ করা। কারণ নদী যদি তার স্বাভাবিক প্রস্থ হারিয়ে ক্রমাগত সঙ্কীর্ণ হতে থাকে তাহলে বড় নদী থেকে পরিষ্কার পানি এনে তার সঙ্গে যুক্ত করলেও শেষ পর্যন্ত নদীর প্রাণ রক্ষা করা যাবে না। কীভাবে সরকার ও সরকারি সংস্থাগুলো পর্যন্ত ভূমিদস্যুদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নদীকে ডাঙ্গায় পরিণত করে নদীর সর্বনাশ করছে এর একটি দৃষ্টান্ত প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এছাড়া এই সর্বনাশের আরও হাজার দৃষ্টান্ত দেশময় ছড়িয়ে আছে। কাজেই এই সমস্যা যদি ‘নদী পুনরুদ্ধার’-এর সমস্যার সঙ্গে যুক্তভাবে না দেখা যায় ও সেই অনুযায়ী কাজ না করা যায়, তাহলে শুধু অন্য নদী থেকে পানি আমদানি করে কোনো নদীকেই প্রকৃতপক্ষে ‘পুনরুদ্ধার’ করা সম্ভব নয়। এর ফলে শত শত কোটি টাকা চোর-দুর্নীতিবাজদের পকেটে চালান দেয়া ছাড়া অন্য কিছুই হবে না।

এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরাসরি পানি দূষণ বন্ধ করা। দূষিত পানির দূষণ কমিয়ে আনার জন্য বাইরে থেকে পানি এনে কোনো নদীতে ফেলার থেকে সেই নদীর দূষণ সরাসরি বন্ধের ব্যবস্থাই হলো আসল কাজ। নদীর স্বাভাবিক প্রস্থ বজায় রেখে যদি সরাসরি নদী দূষণ বন্ধ করা যায় তাহলেই বুড়িগঙ্গা থেকে নিয়ে বাংলাদেশের শত শত নদী তার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা এর ঠিক উল্টো। ঢাকার পার্শ্ববর্তী চারটি নদীর কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে কী পরিমাণ বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য প্রতিদিন এই নদীগুলোতে পড়ে নদীর প্রাণ সংহার করছে। কোটি কোটি গ্যালন এই বর্জ্য ও মানববর্জ্য যেখানে নদীগুলোতে এসে পড়ছে সেখানে এই সমস্যার সমাধান প্রথমে না করে শত শত কোটি টাকা খরচ করে যমুনা নদী থেকে পরিষ্কার পানি এনে বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা যে প্রকৃতপক্ষে নদী রক্ষা নয়, এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো চুরি-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দ অর্থ লুটপাট, এটা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় কে বুকে হাত রেখে অস্বীকার করতে পারে?

ঢাকা শহরের মধ্যে অবস্থিত ট্যানারি বা চামড়ার কারখানাগুলো থেকে বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। বহুদিন থেকে এই ট্যানারিগুলো ঢাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথাবার্তা সরকারি মহলে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। শুধু তা-ই নয়, কতদিনে এই কারখানাগুলো স্থানান্তর সম্ভব হবে সে বিষয়েও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া সাভার, গাজীপুর ইত্যাদি এলাকায় অবস্থিত শত শত শিল্পকারখানা থেকে বিষাক্ত বর্জ্য নদী ও পার্শ্ববর্তী খাল-বিলে পড়ে নদীর পানি দূষিত করছে। একদিকে নদী দখল হতে থাকার কারণে নদীর প্রস্থ কমে এসে পানি প্রবাহ ধীরগতি হওয়া, এমনকি মাঝে মাঝে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা এবং অন্যদিকে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য পদার্থ নিয়মিতভাবে প্রতিদিন নদীগুলোতে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে যমুনা নদী থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গায় ফেলার প্রকল্প নদী পুনরুদ্ধার ক্ষেত্রে এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই দাঁড়াবে না।

নদীগুলো, বিশেষ করে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর যে অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে তাতে নদী দখল বন্ধ এবং নদীতে শিল্পবর্জ্যসহ অন্য বর্জ্য নিক্ষেপ এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বন্ধ করাই হচ্ছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজের জন্য সরকারের কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, নদী দখলকারী ভূমিদস্যু দমন এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলোকে বাধ্য করা বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু অনেক লেখালেখি, আলোচনা, সিটিং সত্ত্বেও এ দুই কাজ সরকারের দ্বারা হচ্ছে না। নদী সাময়িকভাবে দখলমুক্ত করে কাজ দেখালেও কয়েকদিন পর সেগুলো আবার দখল হচ্ছে। কারণ যারা এ কাজ করছে তারা সরকার বা সরকার বহির্ভূত শাসকশ্রেণীর প্রভাবশালী লোক। শিল্প মালিকদের দ্বারা বর্জ্য শোধন না করার কারণও এটাই। আসলে সরকার যেখানে সব রকম ক্রিমিনাল কাজের সব থেকে শক্তিশালী প্রশ্রয়দাতা এবং সরকারি লোকরাই যখন কলকারখানার মালিক ও তাদের আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব এবং দলীয় সমর্থক তখন নদী রক্ষার জন্য যে দুই ধরনের ক্রাইম বন্ধ করার প্রয়োজন অপরিহার্য বলা হয়েছে সে অপরিহার্য কাজ হওয়ার সম্ভাবনা অতিশয় ক্ষীণ। এই অবস্থায় ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’-এর জন্য ৯৪৫ কোটি টাকা ব্যয় দ্বারা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিণতি কী দাঁড়াবে সেটা বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনুমান করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১১/০৮/১১]

No comments:

Post a Comment